সারাদেশ

ফেলানী থেকে আজ পর্যন্ত সীমান্ত হত্যার দীর্ঘ ইতিহাস ও অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন

প্রিন্ট
ফেলানী থেকে আজ পর্যন্ত সীমান্ত হত্যার দীর্ঘ ইতিহাস ও অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন

ছবি : ফেলানী থেকে আজ পর্যন্ত সীমান্ত হত্যার দীর্ঘ ইতিহাস ও অমীমাংসিত কিছু প্রশ্ন


প্রকাশিত : ১৪ মে ২০২৬, বিকাল ৫:২৪

বাংলাদেশ–ভারত সীমান্তে হত্যাকাণ্ড নতুন কোনো ঘটনা নয়, কিন্তু প্রতিবারই এটি জাতির বিবেককে নাড়া দেয়। প্রায় ৪,০৯৬ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্তজুড়ে বহু বছর ধরে ঘটে চলা এসব মৃত্যুর ঘটনা শুধু সীমান্ত নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং রাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষার দায়িত্বের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। বিভিন্ন মানবাধিকার প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত দুই দশকে শত শত বাংলাদেশি সীমান্তে নিহত হয়েছেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গুলির উৎস হিসেবে উঠে আসে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী Border Security Force (BSF)। এই পরিস্থিতি প্রশ্ন তোলে—কেন এই হত্যাকাণ্ড থামছে না, এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার কতটা কার্যকর অবস্থান নিতে পেরেছে। ২০১১ সালে কিশোরী ফেলানী খাতুন–এর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সীমান্ত হত্যার বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে আলোচিত হয়েছিল। কাঁটাতারের বেড়ায় ঝুলে থাকা তার মরদেহের ছবি শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তখন ধারণা করা হয়েছিল, এই ঘটনার পর অন্তত সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের নীতি পরিবর্তন হবে। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, ঘটনাটি প্রতীকী প্রতিবাদ সৃষ্টি করলেও সীমান্ত হত্যার ধারাবাহিকতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। এর পেছনে রয়েছে কঠোর সীমান্ত নিরাপত্তা নীতি, চোরাচালানভিত্তিক সীমান্ত অর্থনীতি এবং কার্যকর জবাবদিহিতার অভাব। এই প্রসঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রকে স্পষ্ট দায়িত্ব দিয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান–এর অনুচ্ছেদ ৩২ নাগরিকের জীবনের অধিকারকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। অর্থাৎ কোনো বাংলাদেশি নাগরিক সীমান্তে নিহত হলে রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব হচ্ছে সেই ঘটনার তদন্ত, প্রতিবাদ এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য সক্রিয় পদক্ষেপ নেওয়া। একই সঙ্গে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৫ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রকে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানায়। ফলে সীমান্ত হত্যার মতো ঘটনা কেবল দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রের সাংবিধানিক অঙ্গীকারের সঙ্গেও সম্পর্কিত। আন্তর্জাতিক আইনও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। মানবাধিকারের মৌলিক নীতিমালা অনুযায়ী বিচারবহির্ভূত হত্যা গুরুতর লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত। Universal Declaration of Human Rights এবং International Covenant on Civil and Political Rights—এই দুই আন্তর্জাতিক দলিল মানুষের জীবনের অধিকারকে সুরক্ষিত বলে ঘোষণা করেছে। ফলে সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের প্রতিটি ঘটনাই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কাঠামোর মধ্যে প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি শক্তিশালী পদক্ষেপ বিবেচনা করা জরুরি। প্রথমত, প্রতিটি ঘটনার ক্ষেত্রে কূটনৈতিক প্রতিবাদকে নিয়মিত ও দৃশ্যমান করা দরকার। দ্বিতীয়ত, Border Guard Bangladesh (BGB) ও BSF–এর মধ্যে যৌথ তদন্ত ব্যবস্থা আরও কার্যকর করা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, বিষয়টি আন্তর্জাতিক ফোরামে—বিশেষত United Nations Human Rights Council–এর মতো প্ল্যাটফর্মে—উত্থাপন করলে আন্তর্জাতিক নজরদারি ও চাপ তৈরি হতে পারে। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে আইনি প্রক্রিয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করা যেতে পারে, যেমন International Court of Justice–এর মতো আন্তর্জাতিক বিচারিক কাঠামোর দিকে দৃষ্টি দেওয়া। তবে শুধু কূটনীতি নয়, সীমান্ত ব্যবস্থাপনাতেও পরিবর্তন দরকার। সীমান্তে অপ্রাণঘাতী অস্ত্র ব্যবহারের বাধ্যবাধকতা, প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি এবং সীমান্ত অঞ্চলে বৈধ বাণিজ্য ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাড়ালে সংঘাতের ঝুঁকি কমতে পারে। কারণ সীমান্তের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে দরিদ্র জনগোষ্ঠী ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, যা অনেক সময় মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ কার্যক্রমে জড়িয়ে ফেলে। শেষ পর্যন্ত সীমান্ত হত্যা বন্ধ করা শুধু দুই দেশের নিরাপত্তা নীতির প্রশ্ন নয়; এটি মানবিকতা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন। প্রতিবেশী দুই রাষ্ট্রের সম্পর্ক যতই বন্ধুত্বপূর্ণ হোক না কেন, সীমান্তে নাগরিকের জীবন রক্ষা সর্বাগ্রে থাকা উচিত। যদি রাষ্ট্র তার নাগরিকের জীবন সুরক্ষায় দৃঢ় অবস্থান নিতে পারে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনীতিকে কার্যকরভাবে ব্যবহার করে, তবে একদিন হয়তো এই দীর্ঘ সীমান্ত মৃত্যুর নয়, সহযোগিতা ও মানবিক মর্যাদার প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।