সারাদেশ

ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনার নামে ভাইরাল হওয়ার অপসংস্কৃতি নির্মূলে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব কি?

প্রিন্ট
ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনার নামে ভাইরাল হওয়ার অপসংস্কৃতি নির্মূলে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব কি?

ছবি : ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনার নামে ভাইরাল হওয়ার অপসংস্কৃতি নির্মূলে রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব কি?


প্রকাশিত : ১১ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর ২:৩৮

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনার মাধ্যমে দ্রুত ভাইরাল হওয়ার যে প্রবণতা ক্রমশ বিস্তার লাভ করছে, তা আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি, সামাজিক শালীনতা এবং গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবেশের জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মৌলিক অধিকার এবং সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্কের অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, এই স্বাধীনতার অপব্যবহার করে অনেকেই ব্যঙ্গ, বিদ্রূপ ও বিকৃত তথ্যের আশ্রয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক মূল্যবোধকে লক্ষ্য করে কটূক্তিমূলক ও বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালাচ্ছে। এর পেছনে অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য থাকে দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করা, অনুসারী বাড়ানো কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া। বর্তমানে ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটকসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে অসংখ্য ভিডিও, পোস্ট এবং কার্টুন প্রকাশিত হচ্ছে, যার একটি বড় অংশেই যুক্তিসংগত সমালোচনার পরিবর্তে বিদ্রূপ, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিকৃত তথ্যের ব্যবহার দেখা যায়। এতে একদিকে যেমন রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, অন্যদিকে সমাজে বিভাজন ও বিদ্বেষের পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যখন রাজনৈতিক বিশ্লেষণের পরিবর্তে কৌতুক, বিদ্রূপ ও অপমাননির্ভর কনটেন্টকে প্রধান তথ্যসূত্র হিসেবে গ্রহণ করতে শুরু করে, তখন তা ভবিষ্যতের রাজনৈতিক সংস্কৃতির জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি স্বীকৃত ধারা হলেও তারও একটি নৈতিক সীমা রয়েছে। ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ কখনোই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা নষ্ট করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়া উচিত না; বরং সামাজিক অসঙ্গতি তুলে ধরার জন্য সৃজনশীল ও বিচক্ষণতাপূর্ণ শব্দ চয়ন ও মার্জিত বাচনভঙ্গী যৌক্তিক সমালোচনার মাধ্যম হওয়া উচিত। কিন্তু বর্তমানে যে প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, সেখানে ব্যঙ্গের আড়ালে অনেক সময়ই মিথ্যা তথ্য, গুজব এবং চরিত্রহননের চেষ্টা লুকিয়ে থাকে। এর ফলে রাজনৈতিক আলোচনা গঠনমূলক দিক হারিয়ে ক্রমে বিদ্বেষপূর্ণ প্রচারণায় রূপ নিচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে বর্তমান সরকারের প্রতি বিশেষভাবে আহ্বান জানানো প্রয়োজন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল ও সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য কার্যকর নীতি ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হোক। তবে এ ক্ষেত্রে অবশ্যই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা নীতিমালা যেন জনগণের ন্যায্য সমালোচনার অধিকারকে সীমিত না করে, বরং অপপ্রচার, মিথ্যা তথ্য ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভ্রান্তি প্রতিরোধে সহায়ক হয় -এই বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে রাষ্ট্রের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন অংশকেও ভূমিকা রাখতে হবে। গণমাধ্যম, বুদ্ধিজীবী সমাজ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সংগঠনগুলোকে সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্কের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে এগিয়ে আসতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে তথ্য যাচাইয়ের গুরুত্ব, দায়িত্বশীল মতপ্রকাশ এবং সমালোচনার নৈতিক সীমা সম্পর্কে সচেতন করে তুলতে হবে। ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়ানোর মাধ্যমে মানুষকে বোঝাতে হবে যে, ভাইরাল হওয়া সব কনটেন্ট সত্য বা গ্রহণযোগ্য নয়। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোরও আত্মসমালোচনার সুযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক দল ও নেতারা যদি নিজেদের বক্তব্য, আচরণ ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে আরও বেশি স্বচ্ছতা, সহনশীলতা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পরিচয় দেন, তবে অযৌক্তিক বিদ্রূপ বা নেতিবাচক প্রচারণার সুযোগও অনেকাংশে কমে যাবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে ভিন্নমত থাকবে, সমালোচনাও থাকবে। কিন্তু, তা হতে হবে যুক্তিনির্ভর, শালীন এবং দায়িত্বশীল। ব্যঙ্গাত্মক সমালোচনার নামে ভাইরাল হওয়ার এই অসুস্থ সংস্কৃতি শুধু রাজনীতিকেই নয়, সামগ্রিক সামাজিক পরিবেশকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিক সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুস্থ, যুক্তিনির্ভর এবং সম্মানজনক রাজনৈতিক আলোচনার পরিবেশ গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করেই যদি দায়িত্বশীল ও নৈতিক রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবেই গণতন্ত্র তার প্রকৃত শক্তি ও মর্যাদা ফিরে পাবে।