ছবি : শরিফ ওসমান হাদী হত্যার দুই আসামী ফয়সাল ও আলমগীর ভারতে গ্রেফতার
প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০২৬, দুপুর ১:০১
ঢাকার রাজনৈতিক অঙ্গনের বহুল আলোচিত নাম শরীফ ওসমান হাদী। কিন্তু তাঁর হত্যাকাণ্ড আজ কেবল একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এটি একটি জটিল, সুসংগঠিত এবং বহুমাত্রিক অপরাধের প্রতিচ্ছবি, যেখানে সীমান্ত, অর্থ এবং ক্ষমতার অদৃশ্য প্রভাব একত্রে কাজ করেছে। তদন্তের শুরুতেই যে নামগুলো সামনে আসে, তারা হলো- ফয়সাল করিম মাসুদ, আলমগীর হোসেন এবং ফিলিপ সাংমা। এদের মধ্যে ফয়সালকে মূল শুটার হিসেবে এবং আলমগীরকে তার সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ফিলিপ সাংমার ভূমিকা ছিল আরও ভিন্ন। এই হত্যাকাণ্ডের পর সে খুনিদের সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করে বলে তদন্তে উঠে এসেছে, যা পুরো ঘটনাকে একটি আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধচক্রে নির্দেশ করেছে। হত্যাকাণ্ডটি কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না; বরং এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফল, যেখানে হত্যার আগে একাধিক গোপন বৈঠক, আর্থিক প্রতিশ্রুতি এবং কৌশলগত সমন্বয় ছিল। এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আলোচিত নাম হলো তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পি। তদন্ত সূত্রে তাঁকে এই হত্যাকাণ্ডের নির্দেশদাতা ও অর্থায়নকারী হিসেবে সন্দেহ করা হয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তদন্তে উঠে এসেছে একটি বিস্ময়কর প্রায় ১২৭ কোটি টাকার সন্দেহজনক আর্থিক লেনদেন। এই অর্থের উৎস, প্রবাহ এবং ব্যবহার এখনও তদন্তাধীন। Criminal Investigation Department (CID) এই লেনদেনকে একটি বৃহৎ মানি ট্রেইল হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যা শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং একটি অর্থনৈতিক অপরাধচক্রের দিকেও ইঙ্গিত করে। তবে এই অর্থ সরাসরি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে কিনা তা এখনো নিশ্চিত নয়। ঘটনার দিন হামলার পর খুনিরা মোটরসাইকেলে করে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে এবং পরিকল্পিতভাবে সীমান্ত অতিক্রম করে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত হয়ে তারা ভারতের মেঘালয়ে প্রবেশ করে এবং পরে পশ্চিমবঙ্গে আত্মগোপন করে। এই পালানোর পথ কেবল একটি কৌশলগত সিদ্ধান্ত ছিল এবং এটি ছিল একটি সুসংগঠিত নেটওয়ার্কের অংশ। যেখানে সীমান্তের উভয় পাশে সহায়তাকারীরা সক্রিয় ছিল। সিসিটিভি ফুটেজ, ব্যালিস্টিক বিশ্লেষণ এবং ডিজিটাল প্রমাণ এই তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে মোবাইল কল রেকর্ড ও মেসেজ আদান-প্রদান বিশ্লেষণ করে তদন্তকারীরা নিশ্চিত হয়েছেন যে, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আসামিদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ ও সমন্বিত যোগাযোগ বজায় ছিল। এই ডিজিটাল প্রমাণগুলো পুরো চক্রটির গতিপথ এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ার পর আসামিদের জেরা থেকে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের জন্য তাদের অর্থের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল এবং সেই অর্থ বিভিন্ন মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফিলিপ সাংমার জবানবন্দি অনুসারে, তাকে প্রভাবশালী মহলের পক্ষ থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়, যার ভিত্তিতে তিনি সীমান্ত পারাপারে সহায়তা করেন। এই তথ্যগুলো হত্যাকাণ্ডের একটি পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত কাঠামোর ইঙ্গিত দেয়। তবে এতসব তথ্যের পরও সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি এখনো অমীমাংসিত। এই হত্যাকাণ্ডের আসল নির্দেশদাতা কে? যদিও বাপ্পির নাম সবচেয়ে বেশি আলোচিত, কিন্তু এটি এখনো বিচারিকভাবে প্রমাণিত হয়নি। একই সঙ্গে তদন্তে আরও কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির নাম উঠে এলেও তাদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি। ফলে এই মামলাটি এখনো একটি “অসমাপ্ত রহস্য” হিসেবেই রয়ে গেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকার ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে আসামিদের দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চালাচ্ছে। তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে এই হত্যাকাণ্ডের পেছনের অদৃশ্য শক্তিগুলো সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে বলে তদন্তকারীদের ধারণা। সবশেষে বলা যায়, এই হত্যাকাণ্ড শুধুমাত্র একটি অপরাধের ঘটনা নয়—এটি একটি বহুস্তরবিশিষ্ট তদন্ত, যেখানে প্রতিটি উত্তর নতুন প্রশ্নের জন্ম দিচ্ছে। এবং সেই প্রশ্নের কেন্দ্রে এখনো দাঁড়িয়ে আছে একটি অন্ধকার সত্য। এই হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত রূপ এখনো পুরোপুরি উন্মোচিত হয়নি।
মতামত