ছবি : ইবি ছাত্রসংগঠনের নেতৃবৃন্দ
জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে সম্প্রতি ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯ শিক্ষক, ১১ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ৩৩ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশে অসন্তোষ প্রকাশ করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। সুপারিশকৃত অভিযুক্তদের দ্রুত শাস্তির আওতায় আনার দাবিতে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ\'র সঙ্গে আলোচনা করেছে তারা। তাদের দাবি— তালিকার বাহিরে থাকা ফ্যাসিস্ট রাঘববোয়ালদের সনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
মঙ্গলবার (১৯ আগস্ট) দুপুরে আলোচনা সভার শেষে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে ব্রিফিং করেন ছাত্রনেতারা। এসময় একযোগে ‘চুনোপুঁটিরা তালিকায়, রাঘববোয়ালরা বাহিরে’ বলে অভিযোগ করেন তারা। এর আগে তদন্ত কমিটির তালিকা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়। এর প্রতিক্রিয়া জানিয়ে গোপনীয়তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেন তারা।
এসময় শাখা ছাত্রদল, ইসলামী ছাত্রশিবির, ছাত্র ইউনিয়নের ইবি সংসদ, ইসলামী ছাত্র আন্দোলন ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন প্লাটফর্মের সাবেক সমন্বয়ক এস এম সুইট সহ ছাত্র সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রেস ব্রিফিং-এ ছাত্র ইউনিয়ন ইবি সংসদের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ গালিব বলেন, ‘তদন্ত কমিটির মতো সেনসেটিভ ইস্যু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভুয়া পেইজে ঘুরেবেড়াচ্ছে। যারা জড়িত তাদেরকে শাস্তির আওতায় আনার জন্যও জানিয়েছি। পাশাপাশি ফ্যাসিস্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে যাতে একাডেমিক কার্যক্রম স্বাভাবিক থাকে— সেই ব্যাপারেও প্রশাসনকে জানানো হয়েছে।’
ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সভাপতি ইসমাইল রাহাত বলেন, আমরা ‘বিপ্লববিরোধী যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতিতে ঐক্যবদ্ধ’ বলে প্রশাসনকে জানিয়েছি। বিপ্লববিরোধী অনেকে প্রকাশিত তালিকার বাহিরে রয়েছে, তাদেরকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
জুলাই যোদ্ধা ও ইবি শাখার সাবেক সমন্বয়ক এস এম সুইট বলেন, ‘তদন্ত কমিটির সুপারিশে যে নামগুলো দিয়েছে তাতে আমরা সন্তুষ্ট না। আরও অনেক রাঘববোয়াল রয়েছে— সুকৌশলে তাদের নাম আসেনি। কোনো একটা পক্ষের ইন্ধনে তালিকাটি করেছে। আমরা প্রশাসনের সাথে কথা বলেছি যে তদন্ত কমিটির কার্যক্রম যেন বন্ধ না করে। তাতে প্রশাসন আশ্বস্ত করেছেন। প্রশাসন জানিয়েছেন যে, তদন্ত চলমান থাকবে এবং যারা দোষী তাদের শাস্তি নিশ্চিত করবেন। যারা নির্দোষ তারাও যেন শাস্তির আওতায় না আসে সেটাও বলেছি।’
এক সাংবাদিকের প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘যারা বিপ্লববিরোধী তারা যেনতেন অপরাধী না। অপরাধের মাত্রা যদি চাকরিচ্যুত করার মতো হয়; তাহলে তাদের চাকরিচ্যুত করতে হবে।’
ইবি শাখা ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুহা. মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘রাঘববোয়ালদের বাহিরে রেখে চুনোপুঁটিগুলো তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। যাদেরকে শোকজ করা হয়েছে তারা বিষয়টা নরমালাইজ করার জন্য দৌড়ঝাঁপ এবং বিভিন্ন জায়গার কথা বলে নেগোসিয়েশনের চেষ্টা করছে। তারা শিক্ষার্থীদের বিভিন্নভাবে ইনফ্লুয়েন্স করার মাধ্যমে ক্যাম্পাসকে অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এক্ষেত্রে প্রশাসনকে আরও সজাগ থাকতে হবে।’
শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক সাহেদ আহম্মেদ বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখেছি—প্রকাশিত তালিকাভুক্তরা ছোটখাটো চুনোপুঁটি, কিন্তু রাঘববোয়ালদের বাহিরে রাখা হয়েছে। আমরা এতে অসন্তোষ প্রকাশ করেছি। তদন্ত কমিটির কাজ শেষ না করে ঘাপটি মেরে বসে থাকা ফ্যাসিস্টদের শাস্তি আওতায় নিয়ে আসার জন্য আমরা ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিরা প্রশাসনকে জানিয়েছি।’
এ বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ জানান, ‘ছাত্রদের দাবির সাথে একাত্মতা পোষণ করছি। তদন্ত কমিটি তালিকা প্রকাশের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
এদিকে ভাইরাল হওয়া তদন্ত প্রতিবেদনে শিক্ষার্থী, প্রত্যক্ষদর্শীদের দেওয়া লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ, বিভিন্ন তথ্যচিত্র, ভিডিও এবং পত্রিকার খবরের ভিত্তিতে যেসকল শিক্ষক, কর্মকর্তা ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মী জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানবিরোধী অবস্থানের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে ১৯ জন শিক্ষক, ১১ জন কর্মকর্তা ও ৩৩ জন ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর নাম উল্লেখ রয়েছে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবিধি অনুযায়ী অভিযুক্ত শিক্ষক, কমকর্তা, কর্মচারী এবং শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করা হয়েছে।
অভিযুক্ত ১১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীরা হলেন, প্রশাসন ও সংস্থাপন শাখার আলমগীর হোসেন খান, আব্দুল হান্নান, ইব্রাহীম হোসেন সোনা, পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অফিসের এবং কর্মকর্তা সমিতির সাধারণ সম্পাদক ওয়ালিদ হাসান মুকুট, একই দপ্তরের আব্দুস সালাম সেলিম, মাসুদুর রহমান, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের উকীল উদ্দিন, ফার্মেসি বিভাগের জাহাঙ্গীর আলম (শিমুল), আইসিটি সেলের জে এম ইলিয়াস, অর্থ ও হিসাব বিভাগের তোফাজ্জেল হোসেন ও জনসংযোগ দপ্তরের আবু সিদ্দিক রোকন।
অভিযুক্ত ৩৩ ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা হলেন, ছাত্রলীগ কর্মী বিপুল খান, সাধারণ সম্পাদক নাসিম আহমেদ জয়, সহ-সভাপতি মুন্সী কামরুল হাসান অনিক, শিমুল খান, রতন রায়, মৃদুল রাব্বী, মাসুদ রানা (ইংরেজি), যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হুসাইন মজুমদার, মেহেদী হাসান হাফিজ, শাহীন আলম, ফজলে রাব্বী, তরিকুল ইসলাম, আইন সম্পাদক শাকিল আহমেদ, দপ্তর সম্পাদক কামাল হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক লিয়াফত হোসেন রাকিব, শেখ সোহাগ, মেজবাহুল ইসলাম, রাফিদ হাসান, উপ-সাংস্কৃতিক সম্পাদক অনিক কুমার, সাহিত্য সম্পাদক আব্দুল আলিম, ক্রীড়া সম্পাদক বিজন রায়, উপ-আপ্যায়ন সম্পাদক মাজহারুল ইসলাম, সদস্য পিয়াস মোস্তাকিন, উপ-কারিগরি সম্পাদক ফারহান লাবিব ধ্রুব, উপ-পাঠাগার সম্পাদক ওরারেসুল রহমান প্রাঞ্জল, প্রচার সম্পাদক নাবিল আহমেদ ইমন, গণযোগাযোগ ও উন্নয়ন সম্পাদক সাদিদ খান সাদি। এছাড়াও ল’ এন্ড ল্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শাওন, অর্থনীতি বিভাগের তানভীর, সমাজকল্যাণ বিভাগের মারুফ ইসলাম, লোকপ্রশাসন বিভাগের আদনান আলিম পাটোয়ারী, ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের ইমামুল মুত্তাকী শিমুল ও মনিরুল ইসলাম আসিফ।
প্রসঙ্গত, গত ১৩ আগস্ট প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত কমিটি। এরপর ‘ফ্যাসিস্ট শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কেন আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে না’ মর্মে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় প্রশাসন। তাতে আগামী ১০ কার্যদিবসের মধ্যে তাদেরকে কারণ দর্শাতে বলা হয়েছে।
মতামত