ছবি : রাষ্ট্রবিরোধী উসকানি ও উগ্রবাদী বক্তব্যে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দেশের ভাবমূর্তি
প্রকাশিত : ২২ মে ২০২৬, দুপুর ১:২১
দেশের আভ্যন্তরীণ আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা রক্ষার্থে উগ্রবাদী বক্তব্য পরিহার করা জরুরি। কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করলেই সমস্যার সমাধান আসে না; বরং তা সামাজিক বিভাজন, সহিংসতা ও অস্থিরতাকে আরও উসকে দেয়। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী কিংবা সংসদে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা দেশের ১৮ কোটি মানুষের নির্বাচিত প্রতিনিধির দায়িত্ব পালন করছেন। তারা অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারী নন যে দেশের প্রতিটি ঘটনা আগাম জেনে তাৎক্ষণিকভাবে প্রতিরোধ করবেন। দেশের আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড দেশেরই কিছু বিপথগামী মানুষ সংঘটিত করছে। তাই একইভাবে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়ে জনমনে উত্তেজনা সৃষ্টি করা বা মব তৈরির চেষ্টা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। দেশ পরিচালনায় নিয়োজিত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের যৌক্তিক, মার্জিত ও গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই হওয়া উচিত। কিন্তু গালাগালি, চরিত্রহনন, সম্মানহানি কিংবা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য দেওয়া আমাদের দেশে এক ধরনের অপসংস্কৃতির জন্ম দিচ্ছে। বাকস্বাধীনতার অর্থ এই নয় যে, যার বিরুদ্ধে যা খুশি ইচ্ছা তাই বলা যাবে বা কাউকে ট্যাগিং, গণপিটুনি কিংবা লাঞ্ছনার জন্য উসকে দেওয়া যাবে। আইনবিরোধী যেকোনো ঘটনার সমাধান অবশ্যই আইনসম্মত পদ্ধতিতেই হওয়া উচিত। বর্তমানে দেশে সংসদ, জনপ্রতিনিধি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দপ্তর বিদ্যমান। তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ না করে বরং সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে দেশের সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসা প্রয়োজন। ব্যক্তিগতভাবে সুচিন্তিত মতামত, আইনসম্মত পরামর্শ এবং সম্মিলিত সুস্থ জনমতই পারে একটি শান্তিপূর্ণ ও দায়িত্বশীল রাষ্ট্র গড়ে তুলতে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সময়ে কিছু মিডিয়া নাম সর্বস্ব ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর উগ্র ও রাষ্ট্রবিরোধী বক্তব্যকে ভাইরাল করার অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। এর ফলে স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব এবং দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা বিঘ্নিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। তাই উস্কানিদাতা ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা রাষ্ট্রের নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব। উগ্রবাদী কর্মকাণ্ড, উসকানিমূলক বক্তব্য ও বিশৃঙ্খল আচরণ শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, বরং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে বৈদেশিক বিনিয়োগ, উন্নয়নমূলক প্রকল্প, রপ্তানি খাত এবং বৈদেশিক সহযোগিতায় গড়ে ওঠা শিল্প-কারখানার ওপর। একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক নিরাপত্তা বিনিয়োগকারীদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যখন বিদেশি বিনিয়োগকারী বা আন্তর্জাতিক অংশীদাররা বাংলাদেশ সম্পর্কে অস্থিতিশীলতা, সহিংসতা কিংবা উগ্র আচরণের সংবাদ পান, তখন স্বাভাবিকভাবেই তাদের আস্থা কমে যায়।
এর ফলাফল হিসেবে নতুন বিনিয়োগ কমে যেতে পারে, চলমান প্রকল্প স্থবির হতে পারে এবং শিল্পখাতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান ব্যাহত হতে পারে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—এ ধরনের পরিস্থিতি বিদেশে শ্রমবাজারেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যদি মনে করে বাংলাদেশে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, তাহলে তারা বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগে অনীহা প্রকাশ করতে পারে। এতে দেশের কোটি মানুষের জীবিকা ও বৈদেশিক রেমিট্যান্স প্রবাহ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে।
গঠনমূলক সমালোচনা গণতন্ত্রের অংশ, কিন্তু উদ্দেশ্যপ্রণোদিত গলাবাজি, উস্কানি কিংবা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা কখনোই দেশের কল্যাণ বয়ে আনে না। দেশের অর্থনীতি, উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক মর্যাদা রক্ষায় সকলের দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা অবশ্যই থাকবে, তবে তা হতে হবে আইনসম্মত, শালীন ও রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা রক্ষার প্রতি দায়বদ্ধ।
মতামত