ছবি : সাম্প্রদায়িক রাজনীতির অভিযোগে শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে নতুন বিতর্ক
প্রকাশিত : ১৯ মে ২০২৬, সকাল ১১:২১
ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দলীয় নেতা ও বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে গত কয়েক বছরে একাধিক রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে তার বিভিন্ন বক্তব্য, রাজনৈতিক অবস্থান এবং জনসম্মুখে দেওয়া মন্তব্য দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। বিরোধী দল, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের একাংশের অভিযোগ তার বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গে ধর্মীয় মেরুকরণ বাড়িয়েছে এবং সংখ্যালঘুদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি সৃষ্টি করেছে।
২০২১ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের সময় থেকেই শুভেন্দু অধিকারীকে ঘিরে বিতর্ক তীব্র আকার ধারণ করে। নির্বাচনী প্রচারণায় তার কিছু বক্তব্যকে কেন্দ্র করে ভারতের নির্বাচন কমিশন তার বিরুদ্ধে “সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক বক্তব্য”-এর অভিযোগে নোটিশ দেয়। অভিযোগ ছিল, তার বক্তব্যে ধর্মীয় বিভাজনমূলক ইঙ্গিত ছিল যা নির্বাচনী আচরণবিধির পরিপন্থী। একই সময় নন্দীগ্রাম কেন্দ্রের ফল প্রকাশের পর তিনি প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন যে তিনি “হিন্দুদের জন্য কাজ করবেন”, কারণ মুসলিম ভোট তার বিরুদ্ধে গেছে। এই মন্তব্য রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার জন্ম দেয় এবং বিরোধীরা এটিকে সংখ্যালঘুবিরোধী রাজনৈতিক অবস্থানের প্রকাশ হিসেবে তুলে ধরে।
পরবর্তী বছরগুলোতেও তার বক্তব্যকে কেন্দ্র করে বিতর্ক অব্যাহত থাকে। ২০২৪ সালে বিজেপির এক সাংগঠনিক বৈঠকে তিনি প্রধানমন্ত্রী Narendra Modi-এর জনপ্রিয় স্লোগান “সবকা সাথ, সবকা বিকাশ” থেকে সরে আসার ইঙ্গিত দিয়ে বলেন, “যারা আমাদের সঙ্গে, আমরাও তাদের সঙ্গে।” রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এই বক্তব্য দলীয় সমর্থকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া হলেও সমালোচকরা এটিকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি বর্জনমূলক বার্তা হিসেবে দেখেছেন। একই বছরে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের এক শিখ কর্মকর্তাকে “খালিস্তানি” বলে উল্লেখ করার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। রাজ্য পুলিশ ওই মন্তব্যকে “সাম্প্রদায়িক উসকানিমূলক” আখ্যা দিয়ে আইনি পদক্ষেপের ইঙ্গিত দেয়, যা নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করে।
২০২৫ সালে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে যখন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, শুভেন্দু অধিকারী মন্তব্য করেছেন যে বিজেপি ক্ষমতায় এলে “মুসলিম বিধায়কদের বিধানসভা থেকে বের করে দেওয়া হবে।” এই মন্তব্যকে কেন্দ্র করে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন। এ ধরনের বক্তব্য শুধু রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আক্রমণ নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিদ্বেষমূলক মনোভাবকে উসকে দিতে পারে। তবে বিজেপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তার বক্তব্যকে “ভুলভাবে উপস্থাপন” করা হয়েছে এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বিতর্ক তৈরি করা হচ্ছে।
মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর শুভেন্দু অধিকারীর সরাসরি রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন পরিচালনার অভিযোগ প্রমাণিত। বিভিন্ন মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা মনে করেন, তার বক্তব্য ও রাজনৈতিক অবস্থান পশ্চিমবঙ্গে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে তীব্র করেছে। বিভিন্ন ঘটনায় মুসলিম ব্যবসায়ী বা ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের উপর হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রকাশ্যে সমর্থন বা সংবর্ধনা দেওয়ার অভিযোগও তার বিরুদ্ধে উঠেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার ভিডিও ও ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর নতুন করে সমালোচনার ঝড় ওঠে। পশ্চিমবঙ্গের দীর্ঘদিনের সাম্প্রদায়িক সহাবস্থানের পরিবেশে এই ধরনের রাজনৈতিক বক্তব্য ও অবস্থান বর্তমানে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়ানোর ঝুঁকি তৈরি করেছে।
মতামত