লেখক:- মোঃ রেজাউল করিম=
বৈশাখী হাওয়ায় যেখানে সোনালী ধানের ঘ্রাণে কৃষকের আঙিনা মৌ মৌ করার কথা, সেখানে আজ সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জসহ বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলে কেবলি হাহাকার। কৃষকের ঘামঝরা স্বপ্ন আজ বৃষ্টির অবিরাম বর্ষণে বিষাদে বিলীন হচ্ছে। মাঠের পর মাঠ আধাপাকা ধান এখন কর্দমাক্ত জলের নিচে পচছে। একে স্রেফ ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বলা হবে সত্যের অপলাপ; বরং এটি এক নির্মম মনুষ্যসৃষ্ট অনিয়মের খেসারত, যার মাশুল দিচ্ছে এ দেশের অন্নদাতারা।
স্বপ্নের সলিল সমাধি ও অকেজো অবকাঠামো
টানা বর্ষণে হাওরের নিচু এলাকাগুলো আজ অতল জলধিতে পরিণত হয়েছে। জমে থাকা পানি বের হওয়ার কোনো পথ নেই। অথচ পানিনিষ্কাশনের জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থে নির্মিত সুইচগেটগুলো আজ নির্বাক, নিথর পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব আর যান্ত্রিক ত্রুটির অজুহাতে এসব গেট এখন অকেজো। কৃষকের ভাষায়, এই জং ধরা সুইচগেটগুলো যেন দুর্নীতির নীরব সাক্ষী হয়ে বলছে— "আমাদের সচল রাখার সামর্থ্য ছিল, কিন্তু আমাদের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে লুটেরা চক্র।" পানি অবরুদ্ধ থাকায় কৃষকের সারা বছরের সঞ্চয় আজ পচনের অপেক্ষায় দিন গুনছে।
পিআইসি: দুর্নীতির নতুন সংজ্ঞায়ন
হাওরের ফসল রক্ষায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার বরাদ্দ আসে পিআইসি (প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি)-র মাধ্যমে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে পিআইসি মানেই যেন ফসল রক্ষা নয়, বরং দুর্নীতির এক ‘আখড়াখানা’। অভিযোগের পাহাড় জমেছে যে, কমিটির নামকাওয়াস্তে সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদকরা অনেক সময় প্রকল্পের খুঁটিনাটি পর্যন্ত জানেন না। নেপথ্যে চলে প্রভাবশালী রাজনৈতিক অশুভ শক্তির ছায়া আর লুটপাটের মহোৎসব। দায়সারা বাঁধ নির্মাণ আর বরাদ্দের টাকা ভাগাভাগিই যেন এখন অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়েছে।
বাঁধের সংকট: কৃষকের উভয়সংকট
পানির চাপে দিশেহারা কৃষক এখন নিজের হাতে গড়া বাঁধ কেটে দেওয়ার কথা ভাবছেন। কিন্তু সেখানেও লুকিয়ে আছে সর্বনাশের ছক। জমে থাকা পানি সরাতে বাঁধ কাটলে সাময়িক মুক্তি মিললেও, বৈশাখের পাহাড়ি ঢল শুরু হওয়া মাত্রই ওই কাটা অংশ দিয়ে প্রবল বেগে পানি ঢুকে অবশিষ্ট ফসলটুকুও ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। একদিকে প্রশাসনের জেল-জরিমানার খড়্গ, অন্যদিকে চোখের সামনে তিলে তিলে ফসলের মৃত্যু— বাংলার কৃষক আজ এক কূল-ওকূল হারানো অসহায় পথিক।
প্রশাসনের দ্বিমুখী নীতি ও রাষ্ট্রের দায়
প্রশ্ন জাগে, বাঁধ কাটলে যখন জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কঠোর নিষেধাজ্ঞা আর জেল-জরিমানার তোড়জোড় থাকে, তখন পিআইসির দুর্নীতির সময় সেই আইনের শাসন কোথায় লুকায়? সরকারি কর্মকর্তারাও যেন এক অদৃশ্য শৃঙ্খলে বন্দি। কৃষকের দুর্দিনে পাশে দাঁড়িয়ে সমাধান খোঁজার চেয়ে নিয়ম-নীতির শিকলে তাঁদের বেঁধে রাখাই যেন প্রশাসনের প্রাথমিক কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন দুর্নীতিবাজরা প্রকল্পের টাকা লুটে নেয়, তখন কেন এই জেল-জরিমানার খড়্গ তাদের ওপর পড়ে না?
উপসংহার: দীর্ঘশ্বাসের অবসান কবে?
হাওরের কৃষক আজ দ্বিবিধ সংকটে জর্জরিত—প্রকৃতির রুদ্ররোষ আর দুর্নীতির রাহুগ্রাস। প্রতি বছর একই চিত্র, একই হাহাকার। এই কাঠামোগত সমস্যা থেকে মুক্তির পথ কোথায়? যদি হাড়ভাঙা খাটুনির পর কৃষক ফসলই ঘরে তুলতে না পারে, তবে এই বিপুল ক্ষয়ক্ষতির দায়ভার কে নেবে? গুটিকয়েক মানুষের পকেট ভরার মাশুল কেন মেহনতি মানুষকে দিতে হবে?
এখনই সময় পিআইসি প্রথার আমূল সংস্কার এবং হাওর অঞ্চলের পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা নিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদী, টেকসই ও স্বচ্ছ পরিকল্পনা গ্রহণ করার। অন্যথায়, সোনালী ধান নয়—প্রতি বছর আমাদের হাওরগুলো কেবল কৃষকের দীর্ঘশ্বাস আর লোনা জলে ভেসে যাবে। রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডকে বাঁচাতে হলে আগে কৃষকের স্বপ্নকে বাঁচানো জরুরি।
মতামত