সুনামগঞ্জের শান্তিগঞ্জ উপজেলায় প্রকৃতি ও আইনের তোয়াক্কা না করে প্রতি বছর শীত মৌসুমে চলছে পাখি শিকারের বর্বরোচিত মহোৎসব। শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে যখন বিলে ও হাওরে পরিযায়ী পাখির কলকাকলি বাড়ে, ঠিক তখনই এই অতিথি পাখিদের যমদূত হয়ে আবির্ভূত হন দরগাপুর গ্রামের দুই ব্যক্তি—নেজামুল হক ও আলমগীর। স্থানীয়দের অভিযোগ, পাখি শিকার যেন তাদের বার্ষিক রুটিনে পরিণত হয়েছে।
অভিযুক্তদের পরিচয়
এলাকার চিহ্নিত এই দুই শিকারি হলেন:
১. নেজামুল হক (পিতা: নজরুল ইসলাম)
২. আলমগীর (পিতা: নুরুল হক)
সাং: দরগাপুর, ৫নং পাথারিয়া ইউনিয়ন, শান্তিগঞ্জ।
মৌসুমে মৌসুমে চলে নিধনযজ্ঞ
অনুসন্ধানে জানা যায়, নেজামুল ও আলমগীরের এই অপতৎপরতা নতুন কোনো ঘটনা নয়। দীর্ঘ দিন ধরে প্রতি বছর শীত মৌসুমে তারা এই জঘন্য কাজে লিপ্ত হন। এলাকাবাসী জানান, বছরের অন্য সময়ে তারা কিছুটা নিষ্ক্রিয় থাকলেও, শীতের শুরুতে যখন সাইবেরিয়া ও হিমালয় থেকে অতিথি পাখিরা শান্তিগঞ্জের বিভিন্ন বিল ও জলাশয়ে আশ্রয় নেয়, তখন তাদের শিকারে নামার তোড়জোড় শুরু হয়।
প্রতি রাতে লাইসেন্সবিহীন এয়ারগান কাঁধে নিয়ে তারা হাওর ও বিলের নির্জন এলাকায় হানা দেন। স্থানীয়রা জানান, "শীত এলেই তাদের হাতে এয়ারগান দেখা যায়। এটা তাদের কাছে একটা বাৎসরিক উৎসব বা খেলার মতো। অথচ এই খেলা কেড়ে নিচ্ছে শত শত পাখির প্রাণ।"
ভিডিও ফুটেজে নিষ্ঠুরতার প্রমাণ
সম্প্রতি ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও ফুটেজে তাদের নিষ্ঠুরতার ভয়াবহ চিত্র ফুটে উঠেছে। সেখানে দেখা যায়, রাতভর শিকার করা বিপুল পরিমাণ পাখির মৃতদেহ তারা প্রজাতিভেদে আলাদা করে পাত্রজাত করছেন। ভিডিওটি প্রমাণ করে যে, এটি কোনো শৌখিন শিকার নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে চলা একটি অভ্যস্ত ও পরিকল্পিত অপরাধ।
আইনের দৃষ্টিতে গুরুতর অপরাধ
নেজামুল হক ও আলমগীরের এই কর্মকাণ্ড প্রচলিত আইনের প্রতি চরম বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন:
১. বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২: আইনের ৬ ও ৩৮ ধারা অনুযায়ী পরিযায়ী পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ। যেহেতু তারা প্রতি বছর একই কাজ করছেন, তাই আইনের দৃষ্টিতে তারা ‘পুনরাবৃত্তকারী অপরাধী’ (Repeat Offenders), যার শাস্তি মূল শাস্তির দ্বিগুণ হওয়ার বিধান রয়েছে।
২. অস্ত্র আইন, ১৮৭৮: অবৈধ এয়ারগান ব্যবহার এবং তা দিয়ে বন্যপ্রাণী হত্যা দণ্ডনীয় ফৌজদারি অপরাধ।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও জনদাবি
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, নেজামুল ও আলমগীরের মতো অভ্যাসগত শিকারিদের এখনই না থামালে এলাকার জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়ে যাবে। শান্তিগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, পুলিশ এবং বন বিভাগের কাছে এলাকাবাসীর জোর দাবি—অবিলম্বে তদন্তপূর্বক এই দুই ব্যক্তির অবৈধ এয়ারগান জব্দ করা হোক এবং বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে ভবিষ্যতে আর কেউ প্রকৃতির বুকে গুলি চালানোর সাহস না পায়।
মতামত