বাঙালি-বিহারীর মিশ্র শহর সৈয়দপুরে ভোট চাইতে বাংলার পাশাপাশি উর্দুতে মাইকিং চলছে
প্রিন্ট
নীলফামারীর প্রতিনিধি:
উত্তরাঞ্চলের রংপুর অঞ্চলের নীলফামারী জেলার সংসদীয় আসন ৪ (চার) এলাকা সৈয়দপুর ও কিশোরীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট ১২ ফেব্রুয়ারী অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই আসনটি অত্যান্ত গুরুত্বপুর্ন। আকাশ পথে উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসাবে পরিচিতি সৈয়দপুর। বিমান যাত্রীরা খুব সহজেই সৈয়দপুর বিমান বন্দর থেকে ঢাকা চট্রগ্রাম ও কক্সবাজার সরাসরি যাওয়া আসা করতে পারেন। পাশপাশি এই সৈয়দপুরকে দেশের অষ্টম ব্যবসা বানিজ্যের শহর বলা হয়ে থাকে। রয়েছে দেশের বৃহৎ রেল কারখানা। আসন্ন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই শহরে বাংলার পাশাপাশি উর্দুভাষায় মাইনিং করে থাকেন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা। স্থানীয়রা জানিয়েছে, বর্তমানে প্রতিদিন দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত চলছে মাইকিং।এতে প্রার্থীদের পক্ষে ভোট প্রার্থনাসহ বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেওয়া হচ্ছে। যেমন মেরি মা বাহিনো আপকা পিয়ারা আপকা দুলারা ... ১২ ফেব্রুয়ারী কো আপনা কিমতি ওট দেকার কামিয়াব কিজিয়ে। এই স্থানে নির্বাচন এলেই উর্দুতে মাইকিং একটি স্বাভাবিক ঘটনা, যেহেতু সৈয়দপুর শহরে প্রায় দেড় লাখ অবাঙালির বসবাস,
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে এ আসনে প্রতিবারের মতো এবারও অবাঙালি (বিহারি) ভোটারদের নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। প্রার্থীরা তাদের নিজের দিকে টানতে নতুন নতুন কৌশল অবলম্বন করছেন। সভা সমাবেশে বাংলার পাশাপাশি বক্তব্য রাখছেন উর্দুতে। ওই ভাষাতেই করছেন কুশল বিনিময়। তবে এবারই প্রথম নয়, ভোট এলেই কদর বাড়ে তাদের। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী প্রার্থীরা জানান, মূলত বয়স্কদের ভোট চাইতেই উর্দুতে মাইকিংয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এতে করে তারা সহজে বুঝতে পারছে কোন প্রার্থীর কি নাম, কোন প্রতীক। যদিও অবাঙালিদের নতুন প্রজন্ম বাংলা বোঝে, পড়তে পারে। কিন্তু যারা একদম বৃদ্ধ তারা অনেকে বোঝেন না।
নির্বাচন অফিসের সুত্র মতে সৈয়দপুর উপজেলার ৫ ইউনিয়ন, একটি পৌরসভা, একটি ক্যান্টনম্যান্ট বোর্ড ও কিশোরীগঞ্জ উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত নীলফামারী-৪ আসন। আসনটিতে মোট ভোটার ৪ লাখ ৪৮ হাজার ৬৪৯ জন। এরমধ্যে নারী ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ৪২৭ জন, পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৪ হাজার ২১৭ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৫ জন। এই আসনে দ্বাদশ নির্বাচনের চেয়ে মোট ভোটার বেড়েছে ২২ হাজার ৫৬২ জন। এর মধ্যে আবার সৈয়দপুর উপজেলায় মোট ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৪ এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ১৩ হাজার ৫২৮ ও পুরুষ ভোটার ১ লাখ ১২ হাজার ৫৬২। তৃতীয় লিঙ্গ(হিজরা) ৪ জন। সৈয়দপুরের মোট ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৯৪ এর মধ্যে অবাঙালি (বিহারী) ভোটার ৭৮ হাজার ৬৭ জন। যার মধ্যে নারী ভোটার ৩৯ হাজার ৯৩৪ ও পুরুষ ভোটার ৩৮ হাজার ১৩৩। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে অবাঙালি ভোটার ছিল ৭৫ হাজার ২২১ জন। এতে এবার অবাঙালী ভোটার বৃদ্ধি পেয়েছে ২ হাজার ৮৪৬। ফলে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিজয়ের নিয়ামক মনে করেন এই সকল অবাঙালী ভোটারদের।
দেশের বৃহত্তম রেলওয়ে কারখানা এখানে অবস্থানের কারণে চাকরি সূত্রে ভারতের বিহার রাজ্যের কর্মচারী ও শ্রমিকরা সৈয়দপুরে অবস্থান করতেন। বিহার, পাকিস্তানের না হলেও দেশটির বহু মুসলিম একটা সময় ভারতের এ অঞ্চলটিতে বসবাস করত। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর অনেকে বিহারে ফিরে গেলেও বেশীর ভাগ অংশ পরিবার পরিজন নিয়ে থেকে যায় সৈয়দপুরে। এছাড়া ১৯৭১ সালের স্বাধীনযুদ্ধের পর দেশের বিভিন্নস্থান থেকেও অবাঙালীরা পরিবার পরিজন নিয়ে সৈয়দপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। সেই থেকে এখন পর্যন্ত সৈয়দপুরে শহরটি বাঙালি-বিহারীর মিশ্র শহর হিসেবে বিবেচিত। এখানে অনেক অবাঙালী বড় বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়ির মালিক হয়েছে। পৌরসভার ১৫টি ওয়ার্ডে তাদের বসবাস। আর পাকিস্তান যেতে ইচ্ছুক নিম্ন আয়ের বিহারীরা শহরের ২২টি আটকেপড়া ক্যাম্পে বসবাস করছেন। ২০০৭ সালে এই অবাঙালীরা প্রথম ভোটার হতে শুরু করেন। এরপর হালনাগাদ ভোটার তালিকায় এই সংখ্যা বৃদ্ধি পায়।
উর্দুভাষী ক্যাম্প উন্নয়ন কমিটির সভাপতি মাজেদ ইকবাল বলেন, আমরা ক্যাম্পবাসীরা ভোটাধিকার পেয়েছি। ক্যাম্পে বসবাসকারী অনেক ছেলে মেয়ে শিক্ষিত। বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, আমরাও বাংলাদেশের নাগরিক। ভোট এলে অনেকে আশ্বাস দেন, ক্যাম্পবাসীর জীবনমান উন্নয়ন করবেন, বাড়ি করে দেবেন, রাস্তা দেবেন কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় না। আমরা বিভিন্ন নাগরিক সুবিধা থেকে বঞ্চিত। দেশে উন্নতি হলেও আমাদের ভাগ্যের উন্নয়ন হয়নি। আবার ভোট এসেছে প্রার্থীরা এখন আমাদের কাছে ভোট চাইছে এবং আমাদের ভাগ্য উন্নয়নের ওয়াদা করছেন।
উল্লেখ যে এই আসনে মোট ৯ জন প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী রয়েছেন। এর মধ্যে জাতীয়পার্টির মো. সিদ্দিকুল আলম (লাঙ্গল), জামায়াতের আব্দুল মুনতাকিম (দাঁড়িপাল্লা), বিএনপির মো. আব্দুল গফুর সরকার (ধানের শীষ), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ শহিদুল ইসলাম (হাতপাখা) বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির মির্জা মো. শওকত আকবর রওশন (কাঠাল), বাসদ মার্কসবাদীর মাইদুল ইসলাম (কাচি), স্বতন্ত্র তিন প্রার্থীদের মধ্যে রিয়াদ আরফান সরকার (ফুটবল) এস,এম,মামুনুর রশিদ (মোটরসাইকেল) ও জোয়াদুর রহমান হীরা (ঘোড়া)।
প্রকাশ থাকে যে নীলফামারী-৪ আসনটি ১৯৮৪ সালে গঠিত হয়, যখন বৃহত্তর রংপুর জেলাকে ভেঙে পাঁচটি জেলায় (নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা) ভাগ করা হয়েছিল। ১৯৮৪-২০১৪ সাল পর্যন্ত নীলফামারী-৪ আসনটি সৈয়দপুর উপজেলা ও কিশোরীগঞ্জ উপজেলার ৬টি ইউনিয়ন (নিতাই ইউনিয়ন, বাহাগিলি ইউনিয়ন, চাঁদখানা ইউনিয়ন, কিশোরীগঞ্জ সদর ইউনিয়ন, গাড়াগ্রাম ইউনিয়ন ও মাগুড়া ইউনিয়ন) নিয়ে গঠিত ছিল।
মতামত