মনিরুল হক চৌধুরী – অদম্য এক যোদ্ধার নাম
ডঃ চৌধুরী সায়মা ফেরদৌসের টাইম লাইন থেকে নেয়া।
পৃথিবীতে এমন সন্তান পাওয়া দুষ্কর, যে তার বাবাকে নিয়ে গর্বিত নয়। এজন্য অবশ্য একজন বাবাকে বিশেষ কিছু হতে হয় না। শুধুমাত্র সন্তানের মাথার ওপর ছায়া হয়ে থাকার যুদ্ধটাই যথেষ্ট বাবাদের তার সন্তানদের চোখে একজন হিরো হবার জন্য।
তবে আমার বাবা, জনাব মনিরুল হক চৌধুরীকে নিয়ে আমাদের বোনদের কিংবা তার পরিবারের গর্বের কারণটা একটু ভিন্ন। আমাদের গর্বের কারণ, মনিরুল হক চৌধুরী একজন অসম্ভব সৎ এবং অদম্য সাহসী যোদ্ধার নাম। ছাত্র জীবন থেকে অদ্যবধি যার যুদ্ধ থেমে যায়নি এক মুহুর্তের জন্য। এই যুদ্ধ তার কখনো দেশের জন্য, মানুষের জন্য , যুদ্ধ তার অন্যায়ের বিরুদ্ধে, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় কিংবা অস্থির সময়ে ঐক্য প্রতিষ্ঠায়।
বাবাকে ‘অদম্য’ বলছি এই কারনে যে, আমরা জানি এই দেশে বেশিরভাগ কাজ খুব সহজে হয় না, সব কিছুই কেমন আঁকাবাঁকা, বিলম্বিত পথ। বন্ধুর এই পথে হেঁটেছেন বাবা তার পুরোটা জীবন। অদম্য মনিরুল হক চৌধুরী কেবল আজ না বরং সেই কিশোর বেলা থেকেই পরাশক্তির বিরুদ্ধে, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসের পাতায় একজন অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠক হিসেবে মনিরুল হক চৌধুরীর স্থান করে নেয়াটা তাই খুবই প্রত্যাশিত এবং স্বাভাবিক। তিনি ভারতের আগরতলা থেকে ট্রেনিং নিয়ে তিনি কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ‘ইন্ডাকশন ইনচার্জ’ ছিলেন এবং জেলা কমান্ডার ও সাব-কমান্ডারের অধীনে থেকে প্রায় ২০০টি অপারেশন সমন্বয় করেন।
স্বাধীনতা পরবর্তীতেও জ়ীবনটা তার অতিবাহিত হয়েছে দেশ, তথা কুমিল্লার উন্নয়নে। তার দুর্দ্যমনীয় এই যাত্রায় কোনো কালে, কোনো সময়ে তিনি ‘না’ মেনে নেননি। মেনে নেননি তার এলাকার মানুষের কল্যানের পথে কোনো বাধাকেই। সারাটা জীবন দেখেছি প্রতি সপ্তাহের শেষ দুদিন তিনি এলাকায় থাকবেনই থাকবেন। এক আল্লাহ ছাড়া কেউ আটকে রাখতে পারেনি তাকে। সপ্তাহের অন্যান্য দিনেও রাত দিন তার বাসার দরজা খোলা অহর্নিশ তার মানুষের জন্য। মোবাইল ফোন ২৪ ঘন্টা খোলা, কারন, কে জানে কোন বিপদে প্রয়োজ়ন হয় তাকে তার এলাকার মানুষের। কোনো ভাবে কারো কোনো সমস্যা তার কানে গেল, ব্যস ছুটলেন চৌধুরী সাহেব হারকিউলিস হয়ে। সমাধানের খোঁজ়ে পাহাড় ডিঙ্গিয়েছেন, সিস্টেমকে প্রশ্ন করেছেন, অফিস থেকে অফিসে ঘুরে, মাথার ওপর দাঁড়িয়ে থেকে এলাকার মানুষের ন্যায্য অধিকার আদায় করেই ফিরেছেন ঘরে। তার আগে নয়।
আমরা বোনেরা কিন্তু ভীষন বাবা অন্তপ্রাণ মানুষ। বয়স তো আমাদেরও কম হলো না, কিন্তু আজও আমাদের জীবনের আনন্দের সময়গুলোতে না হোক, অন্তত কঠিনতম সময় গুলোতে বাবাকে লাগবেই লাগবে। বিশেষ করে পরীক্ষা, ইন্টারভিউ, অপারেশন কিংবা কঠিন অসুস্থতায় আমাদের বাবাকে দেখতে হয়, বাবাকে জড়িয়ে ধরে জানতে হয়, বাবা পাশে আছেন। বাবাকে আমাদের মাথায় হাত দিয়ে বলতে হবে “বাবা দোয়া করছি, কোনো ভয় নেই” তারপরেই আমরা বোনেরা সাহস পাই জীবনের মুখোমুখি হবার। কিন্তু একবার না দুবার না জীবনের প্রায় প্রতিটা সময়ই আমাদের বাবাকে দুচোখ ভরে দেখবার সুযোগ ছাড়াই চলতে হয়েছে। কারন কঠিন সেই সময়গুলোতেও বাবাকে থাকতে হয়েছে তার এলাকার মানুষের সাথে। ফোনেই তাই সেরে নিয়েছেন তিনি আমাদের সাথে কথা।
ছোট বেলায় রাগ হতো! খুব অভিমান হতো! কিন্তু বুঝ হবার পর বুঝেছি, পৃথিবীতে জন্মটা আমাদের মানুষ হিসেবে হলেও, সত্যিকারের মানুষ হিসেবে বেড়ে ওঠার জন্য নিজ স্বার্থ থেকে উর্ধ্বে উঠে দশের হতে হয়… আর সেই রকম একজন সত্যিকারের মানুষের সন্তান হতে পারাটা গর্বের বিষয় বৈকি! আলহামদুলিল্লাহ!
এইরকম কত অসংখ্য ঘটনা আছে, সে না হয় বলবো কোনো একদিন। তবে এই সব অভিযোগ আমাদের ম্লান হয়ে যায় যখন দেখি কুমিল্লাকে নিয়ে নিরলস কাজ করে যাওয়া এই মানুষের হাত ধরেই সদর দক্ষিণ উপজেলা প্রতিষ্ঠা হয়েছে। হাসপাতাল কিংবা কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম রুপকার আমার বাবা। নতুন নতুন রাস্তা নির্মাণ, রাস্তা-ঘাটের ব্যাপক উন্নয়ন, খাল খনন করে তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকার জনগণের মনিকোঠায় স্থান করে নিয়েছেন। তাঁর একক প্রচেষ্ঠায় ও দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার সহায়তায় ২০০৫ সালে সদর দক্ষিণ পৌরসভা করার কারণেই পরবর্তী তা কুমিল্লা পৌরসভার সাথে যুক্ত করে কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন ঘোষণা করা হয়েছে।
বাবা হৃদয়ে ধারন করেছেন তার মাটিকে, আর আল্লাহর অশেষ রহমতে এলাকার মানুষেরাও তাকে জায়গা দিয়েছে তাদের হৃদয়ে। রাজনৈতিক উত্থান পতনে দেখেছি নিজের জীবন বাজি রেখে মানুষেরা বাবাকে কিভাবে আগলে রাখে। সন্তান হিসেবে তাই আমাদের অভিযোগ সাগরসম এই ভালোবাসার কাছে একেবারেই তুচ্ছ। স্বাধীনতার পরবর্তী সময় থেকে ক্ষমতার পালা বদলে বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতার খুব কাছে কিংবা ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুতে থেকেও নির্লোভ এই মানুষটা প্রতিটা সুযোগ ব্যবহার করেছেন মানুষের কাজে। তার ব্যবসা বাড়েনি, ধাই ধাই করে অবৈধ নামহীন দালান উঠে যায়নি, ভবিষ্যত নিশ্চয়তার কোনরকম বন্দোবস্ত তিনি করেননি। কেমন যেন ছুটছেন তিনি, বয়স ক্লান্তি কিছু যেন ছোঁয় না তাকে!
রাজনৈতিক ক্ষমতা ব্যবহার করে লুটপাটের যে কুৎসিত রুপ বর্তমান প্রজন্ম দেখেছে তাদের কাছে বোধহয় আমার বাবার মত মানুষেরা অকল্পনীয়…যিনি আজও ভাড়া করা বাসায় থাকেন, তার নামে কোনো ব্যাংক ব্যালেন্স নেই, শিল্প প্রতিষ্ঠানে মালিকানার অংশীদারিত্ব নেই, তারা ভাই বোন আত্মীয় স্বজনেরা তার থেকে কিছু পাওয়ার আশায় বসে নেই। আছে কেবল চারটা মেয়ে। মেয়েদের বড় করেছেন মাটির সাথে মিশিয়ে, কুমিল্লার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত রেখে। মেয়েদের কাছে একটাই জিনিস চেয়েছেন তিনি…মেয়েরা যেন সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়, এবং নিজ পরিচয় সৃষ্টি করে নেয়। আমার মা, বাবার এই ইচ্ছে টুকু আমাদের মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। আমরা বোনেরা আলহামদুল্লিলাহ চেষ্টা করেছি বাবার সেই ইচ্ছে পূরণ করার। আল্লাহ আমাদের স্বাবলম্বী করেছেন। বাবাকে আমরা সব দাবী ছেড়ে নিশ্চিন্তে তার মানুষের কাছেই থাকবার সুযোগ করে দিয়েছি।
রাজনীতির পথ তাঁর জন্য কখনোই মসৃণ ছিল না। হুমকি ছিল, ভয় ছিল, ছিল ত্যাগের দীর্ঘ অধ্যায়। আপোষ করেননি এক বিন্দুও। অসংখ্য রাত কেটেছে নিদ্রাহীন, নিজের আরামের চেয়ে দায়িত্বকে প্রাধান্য দিয়েছেন বারবার। লোভের মুখে থেকেও ছিলেন নিঃস্বার্থ, অন্যায়ের মুখে থেকেও ছিলেন অটল। বিশেষ করে গত পনের বছরে, যখন গুমের ভয়, নির্যাতন আর কারাবাসের ছায়া ঘনিয়ে এসেছে, তখনও তিনি হার মানেননি। পরিণতি আমরা সবাই জানি। এলাকায় বাবার দূর্দান্ত জনপ্রিয়তা ফ্যাসিবাদি মসনদে কাঁপন ধরিয়েছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে মিথ্যা মামলার আসামী হলেন তিনি। হাজিরা দিতে যাবার সময় অতর্কিত এক সড়ক দূর্ঘটনায় মারাত্মক ভাবে আহত হলেন, ডান হাতটা ভেংগে টুকরা হয়ে গেল, আপোষ করেননি। জেল খেটেছেন, রিমান্ডের হূমকি সয়েছেন, নুয়ে পড়েননি। সেই একি রকম বজ্র কন্ঠে দলের হয়ে, দেশের হয়ে প্রতিবাদ করেছেন গণতন্ত্রের মুক্তির দাবীতে।
গত ১৫ টা বছর নেতা কর্মীদের সাথে নিয়ে তার যে দীর্ঘ সংগ্রাম, তা যারা আজ ভুলে যেতে চান, তাদের বলি, আজকের মুক্তির পাটাতন তৈরির পেছনে হাজারো লাখো নেতা কর্মীর রক্তাক্ত অধ্যায় আছে, আত্মত্যাগ আছে। দূর্বিষহ, ভয়াবহ সেই সময় গুলোতে আমরা, মানে তাঁর মেয়েরা, অনেক সময় বলেছি, “বাবা, আর না, এবার প্লিজ ঘরে ফেরো, প্রায় ৬৫/৭০ বছরতো দিলে রাজনীতিতে। আর কত?” তিনি সবসময় শান্ত গলায় বলতেন, “আমার মানুষগুলোকে একা রেখে আমি ভালো থাকবো না”!
অবাক বিস্ময়ে দেখি, কি অপরিসিম ভালোবাসায় এখনো এগিয়ে চলেছেন তিনি। কুমিল্লা বাচাঁও মঞ্চে কি অসাধারন সব পরিকল্পনা তার কুমিল্লাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ করবার। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দেয়া ৯ দফা আমাকে বিস্মিত করে, তার সাথে আমিও স্বপ্ন দেখি আলোকিত কুমিল্লা নিয়ে। সড়ক, পরিবেশ, শিক্ষা, প্রযুক্তি আর নগরায়নের এমন সব পরিকল্পনা দেখলে মনে হয় এই স্বপ্নদ্রষ্টা জ়ন্মেছিলেনই সেই জেন্টেলম্যান্স পলিটিক্স করবার জন্য যেখানে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে রাজ়নীতি বিদ সৃষ্টি হয়, ব্যাক্তি স্বার্থে নয়। বাবা কুমিল্লাকে আমি দেখতে চান এমন এক আধুনিক মহানগরী হিসেবে, যেখানে আমাদের তরুণরা আর চাকরির চিন্তায় রাত জাগবে না, চিকিৎসার জন্য ছুটে আসবে না শহরে, ভালো চিকিৎসকেরা ছেড়ে যাবেনা সদর হাসপাতাল, মেধা আর অন্য শহরে হারিয়ে যাবে না, সুযোগের অভাবে। এই স্বপ্ন কে বাস্তবায়নের আগে থামবেন না বাবা। আমরাও চাই না বাবা থামুক, এই দেশটা সয়েছে অনেক, কিন্তু দেশকে দেবার মত আত্নত্যাগী, প্রজ্ঞাবান নিঃস্বার্থ মানুষের জন্ম খুব বেশী হয়নি এই দেশে!
ইদানিং সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখতে পাচ্ছি, কিছু মানুষ তাদের অসুস্থ রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য বাবার মত বর্ষীয়ান একজন রাজনীতিবিদের নামে মিথ্যা/ভুল তথ্য ছড়িয়ে তাঁর ত্যাগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছেন। রাজনীতিতে মত পার্থক্য থাকবে, তর্ক-বিতর্ক থাকবে, মত প্রকাশের স্বাধীনতা থাকবে। কিন্তু সেই স্বাধীনতা মানে রাজনৈতিক শিষ্টাচারের সীমালঙ্ঘন নয়। বাবা রাজনীতি করেন, তার কাজ ভালো না লাগলে তার সমালোচনা করেন। কিন্তু আমি বুঝে পাই না এমন বয়স্ক একজন মানুষের নামে সাবলিল ভাবে এত মিথ্যা অপবাদ কিভাবে ছড়াতে পারেন? কি পাচ্ছেন বিনিময়ে? তাদের উদ্দেশ্যে আমি শুধু এটুকুই বলতে চাই — যদি সত্যিই বাবার সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চান, তাহলে কথায় নয় বরং তার স্বপ্নের সাথে, তার কাজের সাথে প্রতিযোগিতা করেন। প্রতিযোগিতা করেন তার সততার সাথে, বিদ্বেষ ছড়িয়ে নয়। তার প্রতি মানুষের যে অকৃত্তিম ভালোবাসা, তাকে ছাড়িয়ে যাবার চেষ্টা করেন নিজ কর্ম গুনে, বিভ্রান্তি দিয়ে নয়। এলাকার মানুষগুলোওকে যদি বাবার থেকেও বেশি ভালোবাসতে পারেন, তাদের নিয়ে বাবার থেকেও বেশি বাস্তব সম্মত স্বপ্ন দেখতে পারেন, তাঁর চেয়েও গভীরভাবে এই দেশকে নিয়ে ভাবতে পারেন, তাহলে প্রথম যে মানুষটি উঠে দাঁড়িয়ে আপনাদের দুহাত মেলে আলিংগন করেবেন তার নাম জনাব মনিরুল হক চৌধুরী।
বাবার বিরোধীদের উদ্দেশে আমার অনুরোধ —গঠনমূলক সমালোচনা করতে শিখুন, মানুষকে সম্মান দিন সে বয়সেরই হোক না কেন। জেনে রাখুন, তীর্যকতম সমালোচনাও করা যায় পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ বজায় রেখে। বিরোধিতা মানেই শত্রুতা নয়। রাজনৈতিক পরিমন্ডলে সমালোচনার নামে যে অসুস্থ ব্যাবস্থা গড়ে উঠেছে, তার সংস্কার তো আমাদের হাতেই। আজকের তরুনেরা বিদ্বেষপূর্ন রাজনীতি দেখেছে গত ১৫ টা বছর। তাদের জন্য একটা সুস্থ রাজনীতির ধারা ফিরিয়ে আনা্র দায়িত্ব আমাদেরই। নতুন প্রজন্ম আমাদের কাছ থেকে আরও ভালো কিছুর দাবিদার।
ছোট এই দেশটা সয়েছে অনেক। এই দেশটা আপনার, আমার, আমাদের সকলের। ভিন্ন ভিন্ন মত নিয়েও কিন্তু আমাদের দাঁড়িয়ে থাকতে হবে একই মাটিতে। কি লাভ বিদ্বেষ ছড়িয়ে? এই সব কোলাহল থেমে যাবে একদিন, থেকে যাবে কেবল একটিই সত্য – বাংলাদেশ নামের সুতোয় গাঁথা আমরা সকলে এক পরিবার।
মতামত