ছবি : মেধাবী ছাত্রী রামিসা হত্যা প্রমাণ গায়েবে আসামী জাকিরের দূধর্ষ পরিকল্পনা
প্রকাশিত : ২১ মে ২০২৬, সকাল ১১:১৬
রাজধানীর মিরপুর–১১ এর একটি সাধারণ ভাড়াবাড়ি। প্রতিদিনের মতোই সেখানে চলছিল মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাপন। কিন্তু সেই পরিচিত পরিবেশের আড়ালেই তৈরি হচ্ছিল এক ভয়ঙ্কর ট্র্যাজেডি। দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছোট্ট রামিসা আক্তারের নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি পরিবারকে শোকের সাগরে ডুবায়নি, বরং পুরো দেশকে নাড়িয়ে দিয়েছে। তদন্তে বেরিয়ে আসা তথ্যগুলো আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ উভয়কেই বিস্মিত করেছে।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্যমতে, ঘটনার দিন সকালে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল রামিসা। কিছু সময় পর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। উদ্বিগ্ন মা আশপাশে খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে পাশের ফ্ল্যাটের সামনে মেয়ের একটি জুতা দেখতে পান। সেই মুহূর্তেই সন্দেহের শুরু। দরজায় বারবার কড়া নাড়লেও ভেতর থেকে অস্বাভাবিক বিলম্বে সাড়া আসে। পরে পুলিশ এসে দরজা খুলে যে দৃশ্য দেখে, তা ছিল অত্যন্ত বিভৎস—খাটের নিচে পড়ে ছিল মাথাবিহীন দেহ, আর বাথরুমে উদ্ধার করা হয় বিচ্ছিন্ন মাথা।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্ত সোহেল রানা ওরফে জাকির হোসেন নামের এক রিকশা মেকানিক এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। তিনি ছিলেন ভিকটিম পরিবারের পাশের ফ্ল্যাটের ভাড়াটিয়া। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, রামিসাকে প্রথমে যৌন নির্যাতন করা হয়ে থাকতে পারে। পরে ঘটনা ফাঁস হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় তাকে হত্যা করা হয় এবং আলামত গোপনের উদ্দেশ্যে মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে রক্তাক্ত আলামত ও ধারালো অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়েছে।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অভিযুক্তের স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের ভূমিকাও এখন তদন্তের আওতায়। পুলিশের ধারণা, তিনি ঘটনাটি জানতেন অথবা অন্তত অভিযুক্তকে পালানোর সুযোগ করে দিতে সহায়তা করেছেন। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, দরজা খুলতে বিলম্ব করা এবং ঘটনার পর অভিযুক্তের রহস্যজনকভাবে পালিয়ে যাওয়া—এসব বিষয় সন্দেহকে আরও ঘনীভূত করেছে। পরে প্রযুক্তির সহায়তায় নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা এলাকা থেকে সোহেল রানাকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অভিযুক্ত আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দিও দিয়েছে। যদিও পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করেনি। ময়নাতদন্ত, ডিএনএ পরীক্ষা ও কেমিক্যাল অ্যানালাইসিস রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে তদন্তকারী সংস্থাগুলো। তবে তদন্তের বর্তমান ধারা বলছে, এটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ড নয়; বরং শিশু নিরাপত্তা, সামাজিক অবক্ষয় এবং অপরাধপ্রবণ মানসিকতার ভয়াবহ প্রতিফলন।
এই ঘটনাটি দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে আসার অন্যতম কারণ হলো—অপরাধী ছিল পরিবারের একেবারে নিকটবর্তী পরিচিত মানুষ। যে ফ্ল্যাটে প্রতিদিন আসা-যাওয়া ছিল স্বাভাবিক, সেই ফ্ল্যাটই পরিণত হয়েছিল মৃত্যুকূপে। ফলে সমাজে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—শিশুরা আসলে কতটা নিরাপদ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও সমাজকেও শিশুদের নিরাপত্তা বিষয়ে আরও সতর্ক হতে হবে।
রামিসার হত্যাকাণ্ড এখন শুধু একটি মামলার নাম নয়; এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের নগরজীবনের নিরাপত্তাহীনতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি। ছোট্ট শিশুটির জন্য বিচার দাবি এখন সাধারণ মানুষের আবেগে পরিণত হয়েছে। তদন্তের শেষ পর্যন্ত দেশবাসীর নজর থাকবে—এই নৃশংসতার পেছনের সব সত্য আদৌ প্রকাশ পায় কি না।
মতামত