গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার রাউৎকোনা গ্রামে একই পরিবারের পাঁচ সদস্যকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় দেশজুড়ে চরম উদ্বেগ ও শোকের সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার (৮ মে) গভীর রাতে সংঘটিত এই হত্যাকাণ্ডে নিহত হন গৃহবধূ শারমিন, তার তিন কন্যাসন্তান মীম, হাবিবা ও ফারিয়া এবং শারমিনের ভাই রসুল মিয়া। শনিবার সকালে একটি ভাড়া বাসা থেকে তাদের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার পর থেকেই পরিবারের কর্তা ফোরকান মিয়া নিখোঁজ রয়েছেন এবং তদন্ত সংশ্লিষ্টরা তাকেই প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে বিবেচনা করছেন। নির্মম এই হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে এখন প্রশ্ন উঠছে—এটি কি দীর্ঘদিনের পারিবারিক অশান্তির চূড়ান্ত পরিণতি নাকি সুপরিকল্পিত ‘ফ্যামিলি কিলিং’?
স্থানীয় সূত্র ও প্রতিবেশীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোরকান মিয়া পেশায় প্রাইভেটকার চালক ছিলেন এবং কয়েক মাস আগে পরিবার নিয়ে প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়িতে ভাড়াটিয়া হিসেবে ওঠেন। শুরু থেকেই ওই পরিবারে কলহ, ঝগড়া ও মারধরের ঘটনা ছিল নিয়মিত। প্রতিবেশীদের দাবি, ফোরকান প্রায়ই নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাড়িতে ফিরতেন এবং স্ত্রী শারমিনের সঙ্গে তার দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল চরম অস্থির। স্থানীয়দের মতে, দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অশান্তি ধীরে ধীরে একটি ভয়াবহ পরিণতির দিকে এগোচ্ছিল, যদিও কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে পুরো পরিবার এক রাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে।
ঘটনাস্থলের বর্ণনা আরও শিউরে ওঠার মতো। পুলিশ জানায়, তিন শিশুকন্যার গলাকাটা মরদেহ ঘরের মেঝেতে পাশাপাশি পড়ে ছিল। শারমিনের ভাই রসুল মিয়ার মরদেহ পাওয়া যায় বিছানার ওপর, আর শারমিনের মরদেহ ছিল জানালার গ্রিলের সঙ্গে হাত-মুখ বাঁধা অবস্থায় ঝুলন্ত। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার করা হয়েছে রক্তাক্ত আলামত, দেশীয় মদের বোতল এবং কিছু লিখিত কাগজপত্র। তদন্তকারীরা বলছেন, হত্যার ধরন ও ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, হত্যাকাণ্ডটি অত্যন্ত নির্মম ও পরিকল্পিতভাবে সংঘটিত হয়েছে।
তদন্তে উঠে এসেছে আরও কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্য। হত্যাকাণ্ডের পর ফোরকান নিজেই কয়েকজন স্বজনকে ফোন করে পরিবারের সবাইকে হত্যা করার কথা জানান এবং লাশ নিয়ে যাওয়ার জন্য বলেন। এছাড়া ঘটনাস্থলে একটি লিখিত অভিযোগপত্র বা চিরকুট পাওয়ার কথাও জানা গেছে। সেখানে স্ত্রীর বিরুদ্ধে পরকীয়ার অভিযোগ, শ্বশুরের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ এবং পারিবারিক দ্বন্দ্বের নানা প্রসঙ্গ উল্লেখ ছিল বলে জানা গেছে। যদিও পুলিশ এখনো এসব তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি, তবে তদন্ত কর্মকর্তারা চিরকুটটির সত্যতা যাচাই ও হাতের লেখার নমুনা পরীক্ষা করছেন।
এই হত্যাকাণ্ডকে পূর্বপরিকল্পিত বলে সন্দেহ করার পেছনে আরও কিছু কারণ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, কয়েকদিন আগে শারমিনের ভাই রসুল মিয়াকে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে কাপাসিয়ায় নিয়ে আসা হয়েছিল। ফলে তদন্তকারীদের ধারণা, শুধু তাৎক্ষণিক রাগ বা দাম্পত্য কলহ নয়, বরং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা করেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়ে থাকতে পারে। একই রাতে ধারালো অস্ত্র দিয়ে পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যা, সম্ভাব্য আলামত রেখে যাওয়া এবং ঘটনার পর অভিযুক্তের পালিয়ে যাওয়া—সবকিছুই একটি সুপরিকল্পিত অপরাধের দিকেই ইঙ্গিত করছে।
ঘটনার পর কাপাসিয়া থানা পুলিশ, সিআইডি, পিবিআই ও ফরেনসিক বিভাগের সদস্যরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। মরদেহগুলো গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। কাপাসিয়া থানার ওসি শাহীনুর আলম জানান, প্রাথমিকভাবে পারিবারিক কলহকে হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। অভিযুক্ত ফোরকানকে গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম অভিযান চালাচ্ছে। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য অন্তত দুজনকে আটক করার খবরও প্রকাশ হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশে সাম্প্রতিক সময়ে পারিবারিক সহিংসতা, মানসিক অস্থিরতা, মাদকাসক্তি ও সামাজিক অবক্ষয়ের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। দীর্ঘদিনের দাম্পত্য দ্বন্দ্ব, আর্থিক চাপ, সন্দেহপ্রবণতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য সংকট সময়মতো চিহ্নিত ও সমাধান না হলে তা ভয়াবহ সহিংসতায় রূপ নিতে পারে। কাপাসিয়ার এই হত্যাকাণ্ড সেই বাস্তবতারই এক মর্মান্তিক উদাহরণ হয়ে সামনে এসেছে। এখনও আতঙ্ক ও শোকে স্তব্ধ রাউৎকোনা গ্রামের মানুষ। তাদের একটাই দাবি—দ্রুত অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে আর কোনো পরিবার এভাবে ধ্বংস না হয়।
মতামত