জাতীয়

চর বোয়ালমারীর বেহাল সড়কে দুর্ভোগ চরমে, ভুট্টা ঘরে তুলতে হিমশিম কৃষক

প্রিন্ট
চর বোয়ালমারীর বেহাল সড়কে দুর্ভোগ চরমে, ভুট্টা ঘরে তুলতে হিমশিম কৃষক

প্রকাশিত : ৭ মে ২০২৬, দুপুর ১২:২৭

রৌমারী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের মঙ্গাপীড়িত জেলা কুড়িগ্রাম দীর্ঘদিন ধরেই দারিদ্র্য, নদীভাঙন ও যোগাযোগ সংকটের কারণে পিছিয়ে থাকা জনপদ হিসেবে পরিচিত। জেলার সীমান্তঘেঁষা রৌমারী উপজেলা উপজেলার উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত চর বোয়ালমারী গ্রামটি আজও উন্নয়নের ছোঁয়া থেকে অনেকটাই বঞ্চিত। স্থানীয়দের ভাষায় “উগান্ডা খ্যাত” এই গ্রামটি বর্ষা মৌসুমে যেন দেশের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চর বোয়ালমারী ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা কয়েক কিলোমিটার দীর্ঘ কাঁচা সড়কটি। বছরের অধিকাংশ সময়ই সড়কটি খানাখন্দে ভরা থাকে। সামান্য বৃষ্টিতেই কাদা ও জলাবদ্ধতার কারণে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়ছেন কৃষকরা। এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষিকাজ। চলতি মৌসুমে চর বোয়ালমারীসহ আশপাশের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে কয়েক হাজার হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষ হয়েছে। স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, শুধু চর বোয়ালমারী এলাকাতেই শত শত কৃষক ভুট্টা চাষের সঙ্গে জড়িত। অনেকে এনজিও কিংবা সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। কৃষকদের অভিযোগ, মাঠে উৎপাদিত ভুট্টা শুকানোর জন্য বাড়িতে নিতে না পারায় তারা চরম দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। ট্রাক, ভ্যান কিংবা নসিমন চলাচল করতে না পারায় অতিরিক্ত খরচে শ্রমিক দিয়ে মাথায় করে ফসল বহন করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ বাড়ছে এবং লাভ কমে যাচ্ছে। স্থানীয় কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, “আমরা অনেক কষ্ট করে ভুট্টা চাষ করেছি। এখন রাস্তায় গাড়ি ঢুকতে পারে না। এক বস্তা ভুট্টা মাঠ থেকে বাড়ি আনতেই অতিরিক্ত টাকা খরচ হচ্ছে।” আরেক কৃষক ছমির উদ্দিন বলেন, “বর্ষার সময় তো চলাচল একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। অসুস্থ রোগী হাসপাতালে নিতে গেলেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। এখন ফসল তোলার সময়েও একই সমস্যা।” স্থানীয়দের দাবি, গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের সময় এলাকার ভোটারদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল যে, ভুট্টা পাকতে না পাকতেই সড়কটির সংস্কার কাজ শুরু হবে। সেই আশ্বাসে সাধারণ মানুষ ব্যাপক উৎসাহ নিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। এলাকাবাসীর ভাষ্য, “ভোটাররা তাদের দায়িত্ব পালন করেছে। এখন জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা।” তবে নির্বাচন শেষ হওয়ার কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও সড়ক সংস্কারের কোনো কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে। স্থানীয় সচেতন মহল জানায়, গত ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠানে শৌলমারী ইউনিয়ন পরিষদের সভাপতির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সংসদ সদস্য বরাবর একটি আবেদনপত্র দেওয়া হয়। সেখানে জরুরি ভিত্তিতে কিছু বালু ও ইটের রাবিশ ফেলে অন্তত অস্থায়ীভাবে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করার দাবি জানানো হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে প্রায়ই “বাজেট আসেনি” বলে জানানো হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর। এক প্রবীণ ব্যক্তি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “এই খেটে খাওয়া মানুষগুলো বাজেট কী সেটা বোঝে না। তারা শুধু বোঝে কষ্ট আর দুর্ভোগ। বছরের পর বছর শুধু আশ্বাসই শুনছি।” শুধু কৃষিপণ্য পরিবহন নয়, সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীদের হাঁটুসমান কাদা মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে যেতে পারে না। এছাড়া গর্ভবতী নারী, বৃদ্ধ ও অসুস্থ রোগীদের উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এলাকাবাসীর অভিযোগ, জরুরি রোগী পরিবহনের সময় অনেক ক্ষেত্রে জীবনঝুঁকিও তৈরি হয়। স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক ও সচেতন মহল দ্রুত সড়কটি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন। তারা বলছেন, অন্তত অস্থায়ীভাবে বালু ও ইটের খোয়া ফেলে সড়কটি চলাচলের উপযোগী করা গেলে কৃষকদের দুর্ভোগ অনেকটাই কমে আসবে। এলাকাবাসী প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে দ্রুত সরেজমিনে গিয়ে বাস্তব অবস্থা পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়েছেন। তাদের মতে, সময়মতো ব্যবস্থা না নিলে কৃষকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি জনদুর্ভোগ আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করবে।