সারাদেশ

“সম্পর্ক বাঁচাবে, নাকি ভাঙবে? আত্মীয়দের নীরব প্রভাব”

প্রিন্ট
“সম্পর্ক বাঁচাবে, নাকি ভাঙবে? আত্মীয়দের নীরব প্রভাব”

ছবি : “সম্পর্ক বাঁচাবে, নাকি ভাঙবে? আত্মীয়দের নীরব প্রভাব”


প্রকাশিত : ১৮ এপ্রিল ২০২৬, ভোর ৩:৪৪

লেখক: মোঃ রেজাউল করিম পরিবার—একটি শব্দ, যার ভেতরে লুকিয়ে আছে নিরাপত্তা, ভালোবাসা, আস্থা ও পারস্পরিক নির্ভরতার অদৃশ্য বন্ধন। এই বন্ধনের পরিধি শুধু বাবা-মা, ভাই-বোনেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে আত্মীয়-স্বজনের বিস্তৃত এক সামাজিক বলয়। এই বলয় কখনো শক্তির উৎস, আবার কখনো অদৃশ্য সংকটের জন্মদাতা হয়ে ওঠে। বাস্তবতা হলো, একটি পরিবারে ছোটখাটো মতবিরোধ বা সমস্যা দেখা দিলে সেটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার অংশ। কিন্তু সমস্যা তখনই জটিল হয়ে ওঠে, যখন বাইরের কেউ—বিশেষ করে আত্মীয়-স্বজন—সমাধানের বদলে উসকানির ভূমিকা নিতে শুরু করেন। তারা অনেক সময় “উপকার” বা “পরামর্শ” দেওয়ার আড়ালে একপক্ষের ভুলকে বড় করে তুলে ধরেন, অন্যপক্ষের কানে সন্দেহের বীজ বপন করেন। ফলাফল—ভুল বোঝাবুঝি বাড়ে, আস্থার জায়গা ক্ষয়ে যায়, আর সম্পর্কগুলো ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে থাকে। বিশেষ করে আমাদের সমাজে বড় ছেলেকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি প্রায়ই দেখা যায়। দায়িত্বের ভার কাঁধে নিয়ে চলা এই মানুষটি যখন ভুল করে বা কোনো সিদ্ধান্তে ব্যর্থ হয়, তখন কিছু আত্মীয় সেই ভুলকে এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন সেটিই তার একমাত্র পরিচয়। তার ত্যাগ, পরিশ্রম বা অবদানগুলো আড়ালে পড়ে যায়। এতে পরিবারে এক ধরনের অদৃশ্য বিভাজন তৈরি হয়—যা অনেক সময় আর সহজে মেরামত করা যায় না। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—আত্মীয়-স্বজনের প্রকৃত ভূমিকা কী হওয়া উচিত? প্রথমত, একজন প্রকৃত হিতৈষী আত্মীয় কখনোই আগুনে ঘি ঢালেন না; বরং আগুন নেভানোর চেষ্টা করেন। তারা সমস্যার গভীরে গিয়ে নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি বোঝার চেষ্টা করেন এবং এমন পরামর্শ দেন, যা সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে সহায়ক হয়। দ্বিতীয়ত, গোপনীয়তা রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারের ভেতরের বিষয় বাইরে ছড়িয়ে দেওয়া বা অন্যদের কাছে আলোচনা করা সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে। একজন দায়িত্বশীল আত্মীয় জানেন—কোথায় কথা বলতে হবে, আর কোথায় চুপ থাকতে হবে। তৃতীয়ত, পক্ষপাতিত্ব পরিহার করা জরুরি। আত্মীয়তা কখনোই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। একপক্ষকে অন্ধভাবে সমর্থন করা মানে অন্যপক্ষের প্রতি অবিচার করা, যা শেষ পর্যন্ত পুরো পরিবারের ভারসাম্য নষ্ট করে। চতুর্থত, সমাধানমুখী মনোভাব গড়ে তোলা দরকার। সমালোচনা করা সহজ, কিন্তু সমাধান দেওয়া কঠিন। একজন সত্যিকারের শুভাকাঙ্ক্ষী সেই কঠিন পথটাই বেছে নেন—যেখানে তিনি সবাইকে এক টেবিলে বসিয়ে আলোচনা, সমঝোতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান খোঁজেন। আমাদের সমাজে আরেকটি প্রবণতা লক্ষণীয়—“কান কথা” বা গুজবের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া। এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। একটি ভুল তথ্য বা বিকৃত বক্তব্য একটি সম্পর্ককে মুহূর্তে ধ্বংস করে দিতে পারে। তাই কোনো বিষয়ে মতামত দেওয়ার আগে সত্যতা যাচাই করা আত্মীয়দের নৈতিক দায়িত্ব হওয়া উচিত। সবশেষে বলা যায়, আত্মীয়-স্বজন পরিবার নামক বৃক্ষের শাখা-প্রশাখার মতো। তারা চাইলে এই বৃক্ষকে আরও সবল, সবুজ ও ছায়াময় করে তুলতে পারেন; আবার ভুল ভূমিকার কারণে শেকড়কেই দুর্বল করে দিতে পারেন। তাই সময় এসেছে—নিজেদের অবস্থান নতুন করে ভাবার। আমরা কি সম্পর্ক জোড়া লাগানোর মানুষ, নাকি ভাঙনের নীরব কারিগর? পরিবার টিকে থাকে বিশ্বাস, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ওপর। আর এই তিনটি বিষয় রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু পরিবারের সদস্যদের নয়, আত্মীয়-স্বজনদেরও সমানভাবে বহন করতে হবে। কারণ, একটি পরিবারের ভাঙন মানে শুধু কয়েকজন মানুষের ক্ষতি নয়—এটি একটি সমাজের নৈতিক কাঠামোকেও নাড়িয়ে দেয়।