ছবি : অবহেলায় ডুবছে সোনালি স্বপ্ন: প্রশাসনের উদাসীনতায় নিঃস্ব হচ্ছে সুনামগঞ্জের কৃষক
প্রকাশিত : ৫ এপ্রিল ২০২৬, দুপুর ২:২০
সুনামগঞ্জ সুনামগঞ্জের আকাশে মেঘ জমলে এখন আর বৃষ্টির সতেজতা নয়, বরং কৃষকের চোখে নামে কান্নার ধারা। প্রতি বছরের মতো এবারও পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) এবং স্থানীয় প্রশাসনের চরম সমন্বয়হীনতা ও অবহেলার বলি হতে যাচ্ছে হাজার হাজার কৃষক পরিবার। আশ্চর্যের বিষয় হলো, নদীতে পানি বিপৎসীমার নিচে থাকলেও শুধুমাত্র ত্রুটিপূর্ণ নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে হাওরের ফসল আজ পানির নিচে।
মেঘে ঢাকা ভবিষ্যৎ, পানিতে ডোবা স্বপ্ন
সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার দেখার হাওর এবং বড় দই বিলসহ জেলার অধিকাংশ হাওরের চিত্র এখন একই। মাঠভরা আধাপাকা ধান এখন কৃষকের গলার কাঁটা। পাহাড়ি ঢল বা নদীর উপচে পড়া পানি নয়, বরং কয়েক দিনের বৃষ্টির পানি বের হতে না পেরে কৃত্রিম জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কৃষকদের দাবি, হাওরের বেড়িবাঁধের কয়েকটি নির্দিষ্ট পয়েন্ট কেটে দিলে বা স্লুইসগেটগুলো সচল থাকলে ২-৩ দিনের মধ্যেই এই পানি নেমে যেত। কিন্তু প্রশাসনের মৌনতা আর পাউবোর অনড় অবস্থানের কারণে তলিয়ে যাচ্ছে শতকোটি টাকার ফসল।
দায়ভার কার?
হাওরের ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণে প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ হয়। অথচ পানি নিষ্কাশনের মতো সাধারণ একটি সমস্যার সমাধান কেন নেই, তা নিয়ে উঠছে বড় প্রশ্ন। স্থানীয়দের অভিযোগ:
পাউবোর গাফিলতি: সময়মতো স্লুইসগেট মেরামত না করা এবং অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ।
প্রশাসনের উদাসীনতা: মাঠপর্যায়ে কৃষকের আর্তনাদ শোনার মতো কেউ নেই। জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের উদ্যোগ নিতে প্রশাসনের দীর্ঘসূত্রতা পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
দুর্নীতি ও লুটপাট: বাঁধের কাজে বরাদ্দকৃত অর্থের সঠিক ব্যবহার না হওয়া এবং নিয়ম রক্ষার বাঁধ দিয়ে কৃষকের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা।
"নদীতে তো পানি নাই, সব পানি আটকা পইড়া আছে হাওরে। বাঁধটা একটু কাইটা দিলে আমরা জান বাঁচত, ধানও বাঁচত। কিন্তু হেরা (প্রশাসন) শুনে না। আমাগো না খাইয়া মরার ব্যবস্থা করতাছে।" > — দেখার হাওর এলাকার একজন আর্তনাদকারী কৃষক।
জবাবদিহিতা কি আদৌ হবে?
একটি কৃষিপ্রধান অঞ্চলে যখন বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় ফসল ডুবে যায়, তখন সেটি আর 'প্রাকৃতিক দুর্যোগ' থাকে না, বরং তা 'মনুষ্যসৃষ্ট দুর্যোগ' হিসেবেই গণ্য হয়। হাজার হাজার পরিবার যখন আবারও ঋণের জালে আটকা পড়ার শঙ্কায় দিন গুনছে, তখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের এই নীরবতা অপরাধের শামিল।
এলাকাবাসীর দাবি,
অবিলম্বে দেখার হাওর ও বড় দই বিলসহ ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে। যারা দায়িত্বে অবহেলা করে কৃষকের স্বপ্ন ডুবিয়েছে, তাদের কি আদৌ কোনো জবাবদিহিতার আওতায় আনা হবে?
নাকি প্রতিবারের মতো এবারও তদন্ত কমিটির নামে কালক্ষেপণ করে কৃষকের ক্ষততে লবণের ছিটা দেওয়া হবে?
সুনামগঞ্জের অস্তিত্ব এই হাওর আর ধান।
সেই ধান যদি সরকারি দপ্তরের ফাইল আর আলস্যের কারণে নষ্ট হয়, তবে এই দায় প্রশাসন কোনোভাবেই এড়াতে পারে না। এখন সময়ের দাবি—দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দোষীদের বিচার।
মতামত