আবরার ফাহাদের স্মৃতি আমাদের তরুণ সমাজের দৃঢ় দেশপ্রেমের এক অনবদ্য প্রতীক। শ্রেণি, প্রতিষ্ঠান বা পেশার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয় এই স্মৃতি; আবরার সোশ্যাল মিডিয়াতেই দেশের সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বলেছিলেন এবং তারই মূল্য প্রাণ দিয়ে দিয়েছেন। ২০১৯ সালের ৬ অক্টোবর রাতে বুয়েটের শের-ই-বাংলা হলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা নির্যাতনের পর তার মৃ*ত্যু ঘটে ৭ অক্টোবর ভোরে। ময়না*তদন্তে উল্লেখ করা হয়, ভোঁতা আঘাতের কারণে তার মৃ*ত্যু হয়েছে। এই ঘটনা মুহূর্তেই সারাদেশে ক্ষোভ ও প্রতিবাদের স্ফুলিঙ্গ জ্বালায়।
আবরার ফাহাদ হ*ত্যা মামলায় ২০২১ সালের ৮ ডিসেম্বর ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল-১ বিশ জনকে মৃ*ত্যুদ*ণ্ড ও পাঁচ জনকে যাবজ্জীবন কারা*দণ্ড দেয়। ২০২৫ সালের ১৬ মার্চ হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখে এবং একই বছরের ৩ মে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। এই বিচার আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি শাসনব্যবস্থা যখন দলীয় ছাত্রসংগঠনের মাধ্যমে যুবসমাজের উপর ভয় ও আনুগত্য চাপিয়ে দিতে চায়, তখন সেখানেই প্রতিরোধের জন্ম হয়। আবরারের স্মৃতি তাই শুধু ভালোবাসার প্রতীক নয়, বরং সেই নৃশংস রাজনীতির দলিলও, যা তরুণদের কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চেয়েছিল।
এই স্মৃতির পাশে আমরা একটি স্থায়ী স্মারক, আবরার স্মৃতিস্তম্ভ, কল্পনা করি। এটি আমাদের আরেকটি বড় সত্যও মনে করিয়ে দেয়: ক্যাম্পাস রাজনীতি শূন্য থাকতে পারে না। ছাত্ররাজনীতির সংস্কৃতি ছাত্রদের বক্তব্য রাখার অধিকারকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, তবে সেটি দলীয় ও জাতীয় রাজনীতির দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত হতে হবে। বুয়েটে ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসে আবরার হ*ত্যার পর ক্যাম্পাস রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়। ২০২৪ সালের ১ এপ্রিল হাইকোর্ট সেই নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করে ঘোষণা দেয়, ‘ছাত্র রাজনীতিতে কোনো বাধা নেই’। তবে একই বছরের সেপ্টেম্বরে বুয়েট প্রশাসন নতুন করে নিষেধাজ্ঞার নোটিশ জারি করলে আবারও টানাপোড়েন তৈরি হয়। এই অনিশ্চয়তা প্রমাণ করে, আমাদের দরকার ছাত্রদের অধিকার কেন্দ্রিক একটি চার্টার: বাইরের রাজনৈতিক প্রভাব ও টাকার প্রবেশ নিষিদ্ধ করা, স্বাধীনভাবে নির্বাচিত ছাত্রসংসদ, স্বচ্ছ আর্থিক নিয়ম, সহিংসতার শূন্য সহনশীলতা, এবং তথাকথিত ‘অতিথি কক্ষ’-ধাঁচের নিপীড়ন সংস্কৃতির সম্পূর্ণ অবসান।
বিশ্বজুড়ে এমন স্মৃতিস্তম্ভ কীভাবে ইতিহাস-সচেতন গর্ব গড়ে তোলে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত আছে। দদক্ষিণ আফ্রিকার হেক্টর পিটারসন মিউজিয়াম ১৯৭৬-এর সোয়েটো বিদ্রোহের শহীদ ছাত্রদের স্মৃতিকে শিক্ষাক্রম, ট্যুর ও বার্ষিক স্মরণানুষ্ঠানে বেঁধে দিয়েছে। যুবাদের ভাষা আরোপের বিরুদ্ধে লড়াই আজও সেখানে গণতান্ত্রিক নাগরিকত্বের পাঠ। যুক্তরাষ্ট্রে কেন্ট স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ের মে ৪ মেমোরিয়াল ভিয়েতনামবিরোধী ছাত্র হ*ত্যার স্মৃতি ধরে রাখে। এটি ক্যাম্পাসে প্রতিবাদের নৈতিকতা শেখায়। প্রাগে ইয়ান পালাখ স্মারক স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তরুণের আত্মত্যাগকে সভ্যতার বিবেকে পরিণত করেছে। দক্ষিণ কোরিয়ার গওয়াংজুর মে ১৮ ন্যাশনাল সেমেট্রি ছাত্র-নেতৃত্বাধীন গণআন্দোলনের স্মৃতি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের অংশ করেছে। এসব উদাহরণ দেখায়, স্মৃতি যখন স্থান পায় তখন ইতিহাস শুধু পড়া নয়, চর্চা হয়; পরবর্তী প্রজন্ম সাহস শেখে।
আবরারের জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ স্মৃতিস্তম্ভ মানে শোকের পাথর নয়, বরং এক নীতির শপথ: সার্বভৌমত্ব নিয়ে কথা বলার অধিকার, নিরাপদ ও স্বাধীন ক্যাম্পাস, এবং দলমুক্ত ছাত্রকেন্দ্রিক রাজনীতি। স্মৃতির শিখা জ্বলুক, যেন ভবিষ্যৎ প্রজন্ম জানে এই দেশে সত্য বলার মূল্য প্রাণ নয়, সম্মান।
এনডিএম এর মাননীয় চেয়ারম্যান জননেতা ববি হাজ্জাজ
মতামত