সারাদেশ

ঈদ যাত্রায় সড়ক দূর্ঘটনার দায় কার? একে অন্যের উপর দায় চাপানোর অপসংস্কৃতির অবসান হোক।

প্রিন্ট
ঈদ যাত্রায় সড়ক দূর্ঘটনার দায় কার? একে অন্যের উপর দায় চাপানোর অপসংস্কৃতির অবসান হোক।

ছবি : ঈদ যাত্রায় সড়ক দূর্ঘটনার দায় কার? একে অন্যের উপর দায় চাপানোর অপসংস্কৃতির অবসান হোক।


প্রকাশিত : ৩০ মে ২০২৬, সকাল ৯:০৮

​প্রতি বছরই ঈদ উৎসবের অনাবিল আনন্দ দেশের হাজারো পরিবারের জন্য আকস্মিক বিষাদে পরিণত হয় মহাসড়কের নির্মম প্রাণহানিতে। চলতি ২০২৬ সালের ঈদুল আযহার ঈদযাত্রাও এর ব্যতিক্রম হয়নি; ঈদের আগের ও পরের দিনগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনায় বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, যার একটি বড় অংশই ছিল উঠতি বয়সী মোটরসাইকেল আরোহী। গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় ঘটে যাওয়া এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাগুলো আমাদের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার এক চরম অব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোগত দুর্বলতাকেই পুনরায় সামনে এনে দাঁড় করিয়েছে। তবে এই সড়ক দূর্ঘটনার দায় এককভাবে কোনো একটি নির্দিষ্ট পক্ষের ওপর চাপানোর সুযোগ নেই। এটি মূলত রাষ্ট্র, পরিবহন খাত এবং সাধারণ জনগণের এক সম্মিলিত অসচেতনতা ও দীর্ঘদিনের পুঞ্জীভূত ব্যর্থতার যৌথ খতিয়ান। ​একটি নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করার প্রাথমিক ও প্রধান দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু আইন বাস্তবায়নে শিথিলতা, মহাসড়কে নিষিদ্ধ ও ধীরগতির থ্রি-হুইলার বা ফিটনেসবিহীন লক্কড়-ঝক্কড় যানবাহনের অবাধ চলাচল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও ত্রুটিপূর্ণ সড়ক নকশা সংস্কারে উদাসীনতা সরকারি সংস্থাগুলোর ব্যর্থতাকে নির্দেশ করে। কঠোর সড়ক পরিবহন আইন থাকা সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে তার সুনির্দিষ্ট ও নিরপেক্ষ প্রয়োগ না থাকায় চালকদের মধ্যে আইন অমান্য করার এক ধরনের দায়হীন সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, পরিবহন সেক্টরের বিশৃঙ্খলা ও মালিক-শ্রমিকদের অতি-মুনাফার লোভ এই সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে। ঈদের বাড়তি আয়ের আশায় চালকদের পর্যাপ্ত বিশ্রাম না দিয়ে একটানা দূরপাল্লার ট্রিপে বাধ্য করা এবং অনেক ক্ষেত্রে অদক্ষ বা লাইসেন্সবিহীন চালকের হাতে ভারী যানবাহনের স্টিয়ারিং তুলে দেওয়ার চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ যাত্রীদের। ফাঁকা রাস্তায় চালকদের বেপরোয়া গতি ও ওভারটেকিংয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতাও এই মৃত্যুর মিছিলকে দীর্ঘায়িত করছে। ​তবে এই কাঠামোগত ত্রুটির পাশাপাশি সাধারণ জনগণের চরম অসচেতনতা এবং ট্রাফিক নিয়ম অগ্রাহ্য করার মানসিকতাও সমানভাবে দায়ী। সাম্প্রতিক সময়ের দুর্ঘটনাগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোটরসাইকেলের বেপরোয়া গতি, হেলমেট ব্যবহারে উদাসীনতা এবং একই বাইকে অতিরিক্ত যাত্রী বহনের কারণে সবচেয়ে বেশি তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। এছাড়া উৎসবের মৌসুমে যেকোনো উপায়ে বাড়ি ফেরার তাড়নায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ট্রাক, পিকআপ ভ্যান বা ট্রেনের ছাদে চড়ে বসা এবং মহাসড়কে নিয়ম না মেনে যত্রতত্র রাস্তা পারাপার হওয়া জনগণের নিজস্ব অসতর্কতারই বহিঃপ্রকাশ। অতএব, সড়ককে নিরাপদ করতে হলে কেবল আশ্বাস বা একে অপরের ওপর দোষারোপের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। সরকারকে যেমন আইনের কঠোর ও বৈষম্যহীন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, তেমনি পরিবহন খাতকে চালকদের মানবিক কর্মঘণ্টা ও উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। সর্বোপরি, সাধারণ মানুষের মধ্যে নাগরিক সচেতনতা ও জীবন রক্ষায় ট্রাফিক আইন মেনে চলার স্বতঃস্ফূর্ত মানসিকতা জাগ্রত না হলে, প্রতি ঈদে মহাসড়কগুলোকে এই মৃত্যুফাঁদ থেকে মুক্ত করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।