সারাদেশ

'পারিবারিক পলিটিক্যাল হেজিং' -নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের নতুন সুরক্ষাকবচ

প্রিন্ট
'পারিবারিক পলিটিক্যাল হেজিং' -নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের নতুন সুরক্ষাকবচ

ছবি : 'পারিবারিক পলিটিক্যাল হেজিং' -নির্বাচন পরবর্তী সময়ে অপরাধীদের নতুন সুরক্ষাকবচ


প্রকাশিত : ৯ জুন ২০২৬, সকাল ১০:১৯

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ক্ষমতার পালাবদল সবসময়ই নতুন মেরুকরণের জন্ম দেয়, কিন্তু গণঅভ্যুত্থান ও নির্বাচন পরবর্তী সময়ে একটি ভয়ঙ্কর প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা রাজনৈতিক ভাষায় \'পারিবারিক পলিটিক্যাল হেজিং\' বা সুবিধাবাদী পারিবারিক কৌশল। বিগত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনকালে যারা রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, অর্থপাচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সাথে সরাসরি যুক্ত ছিল, তাদের অনেকেই এখন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতায় টিকে থাকতে ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে। রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একই পরিবারের সদস্যদের ভিন্ন ভিন্ন দলে সম্পৃক্ত করার এই \'কৌশলগত ভারসাম্য\' এখন চিহ্নিত অপরাধীদের জন্য সবচেয়ে বড় সুরক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে। আওয়ামীলীগ সরকারের পতনের পর যখন সারা দেশে জবাবদিহিতার দাবি উঠেছে, তখন অপরাধীরা তাদের আত্মীয়দের রাজনৈতিক পরিচয়কে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। স্থানীয় পর্যায়ে মহানগর, ইউনিয়ন ও মহল্লাগুলোতে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের দুর্ধর্ষ দোসররা এখন তাদের বিএনপি বা জামায়াত ঘরানার আত্মীয়দের রাজনৈতিক পরিচয়ের আশ্রয়ে প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়াচ্ছে। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনেও উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরে দীর্ঘকাল ধরে চলা এই সুবিধাবাদ রাষ্ট্রযন্ত্রের জবাবদিহিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। বিশেষ করে স্থানীয় প্রশাসন যখন রাজনৈতিক বিবেচনায় কাজ করে, তখন এই অপরাধীরা সহজেই নিজেদের \'নির্দোষ\' বা \'নিরপেক্ষ\' প্রমাণ করার সুযোগ পায়। গণঅভ্যুত্থান ও নির্বাচন পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তি ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিগত দিনের রাজনৈতিক অপরাধীদের চিহ্নিত করার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য বা নতুন প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে নিজেদের অবস্থান পাকাপোক্ত করতেই বেশি ব্যস্ত। আরএসআইএস (RSIS) এর সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও উঠে এসেছে যে, রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগে এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারির অভাবে প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন গোষ্ঠী ও চিহ্নিত অপরাধীরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে গা ঢাকা দেওয়া এই ব্যক্তিরা কেবল অপরাধের বিচার প্রক্রিয়াকেই বাধাগ্রস্ত করছে না, বরং নতুন সরকারের প্রতি জনগণের আস্থায় ফাটল ধরাচ্ছে। যদি অপরাধীদের কেবল তাদের বর্তমান রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার ভিত্তিতে দেখা হয়, তবে জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষ্য—\'বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান\'—অব্যাহত থাকবে। অপরাধের রেকর্ড বা অতীতে সংঘটিত সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডের ইতিহাসকে উপেক্ষা করে যদি কাউকে ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা ভবিষ্যতে আরও বড় নাশকতা ও অস্থিতিশীলতার পথ প্রশস্ত করবে। চিহ্নিত অপরাধীদের পারিবারিক পরিচয়ের আড়ালে এই যে \'অভয়শ্রম\' গড়ে উঠেছে, তা নিরাময়ের জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক দায়বদ্ধতা। রাষ্ট্র যখন পরিবারতন্ত্র বা গোষ্ঠীস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে কেবল অপরাধের রেকর্ড অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে, তখনই কেবল এই \'ছদ্মবেশী\' চক্রের পতন সম্ভব। নতুবা, এই পারিবারিক সুবিধাবাদের কৌশল কেবল স্বৈরাচারের দোসরদেরই রক্ষা করবে না, বরং আগামী দিনে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেবে। ​তথ্যসূত্র: ১. হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (জানুয়ারি ২০২৪): বাংলাদেশের নির্বাচন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়ন সংক্রান্ত প্রতিবেদন। ২. আরএসআইএস (RSIS) নলেজ পোর্টাল (২০২৫): রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নিরাপত্তা ঝুঁকি সংক্রান্ত বিশ্লেষণ। ৩. বিজিআই লাইব্রেরি (২০২৫): জুলাই অভ্যুত্থানের প্রত্যাশা ও ফ্যাসিবাদী দোসরদের বিচারের প্রয়োজনীয়তা বিষয়ক জাতীয় সেমিনার। ৪. ইইউ রিপোর্টার (২০২৫): বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার এবং সুবিধাবাদ সংক্রান্ত প্রতিবেদন। স্থানীয় পর্যায়ে সচেতন নাগরিক ও রাজনৈতিক সংগঠন যদি তাদের মহল্লার এমন \'ছদ্মবেশী\' অপরাধীদের তালিকা প্রস্তুত করে গণমাধ্যমে বা স্থানীয় থানায় প্রকাশ করে, তবে প্রশাসন এটি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করতে সক্ষম হবে?