ছবি : ভুক্তভোগী পাবলিক পথে পথে ঘুরছে প্রতারক কামরুল চলছে প্রাইভেটে
পুলিশ, সেনাবাহিনীসহ বিভিন্ন বিভাগে সরকারি চাকরি দেয়ার নামে পাবলিকের কয়েক কোটি টাকা আত্মসাৎ করা যশোরের শহরতলী তুলা নুরপুরের আলোচিত প্রতারক কামরুল গা ঢাকা দিলেও প্রাইভেটে চেপে বেড়াচ্ছেন গোপনে। এদিকে তার প্রতারণার শিকার হয়ে টাকা খুইয়ে অনেক পাবলিক এখনও পথে পথে ঘুরছেন।
শুধু প্রতারণাকে পুঁজি করে চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেয়া কামরুল এখন ঠাঁটেবাটে চললেও একসময় তিনি মুরগি চুরি করে ধরা পড়েন। অথচ এখন বিপুল অর্থবৈভবের মালিক বনে গেছেন।
যশোরসহ পার্শ¦বর্তী জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে বেকার যুবক ও তাদের পরিবার তার প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হওয়া লোকজন দ্রুত তার আটক ও শাস্তি দাবি করেছেন। একইসাথে দৈনিক গ্রামের কাগজে তার বিরুদ্ধে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশিত হওয়ায় সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরাসহ এলাকার অনেকে। তারা গ্রামের কাগজ দপ্তরে তার বিরুদ্ধে দিচ্ছেন প্রতারণার আরও নানা তথ্য।
মামলা, পুলিশ ও একাধিক ভুক্তভোগী থেকে তথ্য মিলেছে, তোলা নুরপুরের মোদাচ্ছের হোসেনের ছেলে কামরুল ইসলাম এক সময় যশোরের বিভিন্ন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে দোকানে দোকানে বেকারীর রুটি পাউরুটি ভ্যানে করে বিক্রি করে বেড়াতেন। এরপর হঠাৎ তিনি প্রচার করতে থাকেন যশোর ক্যান্টনমেন্টে তার বড় বড় অফিসারের সাথে পরিচিতি হয়েছে, সেনাবাহিনীতে লোক নিয়োগের সময় তিনি ঢুকিয়ে দিতে পারবেন। এসব ধুয়ো তুলে প্রচারণা চালিয়ে প্রতারণা কার্যক্রম শুরু করেন। আর এই প্রতারণা কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য একটি সিন্ডিকেট তৈরি করেন। তার চক্রে মণিরামপুর উপজেলার হাকোবা গ্রামের পলাশ কুশারী, দুর্গাপুর গ্রামের বুলবুল আহমেদ, যশোর সদর উপজেলার এড়েন্দা গ্রামের সুমন হোসেন, শহরের বাবলাতলা এলাকার বজলু ওরফে দাউজ, অভয়নগরের শাহীনসহ কয়েকজনকে ভিড়িয়ে প্রতারণার কারবার শুরু করেন।
দেশের বিভিন্ন স্থানে তার আরো কিছু লোক রয়েছে। তারা প্রতারণায় ফেলতে কমিশনের ভিত্তিতে চাকরি প্রার্থী সংগ্রহ করে কামরুলের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর কামরুল সেই প্রার্থীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় করে পথে বসিয়ে নানা টালবাহানা করতে থাকেন।
যশোরের কেশবপুরের পলাশ, নড়াইলের আমিনুর রহমান, কুষ্টিয়ার রুবেলসহ ডজনখানেক ভুক্তভোগীর অভিযোগে দৈনিক গ্রামের কাগজে বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশিত হলে আসছে আরো তথ্য। চাকরি দেয়ার নামে ওক্ত ভুক্তভোগীদের নিজের, আত্মীয় ও পরিচিতজনদের কাছ থেকে কোটি টাকার উপরে হাতিয়ে নেন ওই কামরুল ও তার চাকরি প্রতারণা চক্রের লোকজন। পুলিশ সেনাবাহিনী ও আরো কয়েকটি দপ্তরে চাকরি দেয়ার নামে টাকা হাতিয়ে নেয়া হয়। এ নিয়ে কয়েক দফা আইনপ্রয়োগকারী সংস্থার হাতে আটক হলেও বিনা পুঁজির এই চাকরি প্রতারণার ব্যবসা ছাড়তে পারেননি কামরুল।
পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর এলাকার আরো কয়েকজন অভিযোগ করেছেন, কামরুল ইসলাম প্রথম জীবনে মুরগি চুরি করার কাজ করত। গ্রামে চুরি করে ধরা খেয়ে স্থানীয়দের কাছে ক্ষমা চেয়ে মাফ পান। বিদ্যুৎ নামে রাজনৈতিক দলের স্থানীয় এক নেতার হাতেপায়ে ধরে তিনি রক্ষা পেয়ে, পরে ওই রাস্তা পাল্টিয়ে চাকরি প্রতারণায় হাত পাকান। মুরগি চুরি করে কামরুল ধরা পড়েন এমন তথ্য স্বীকারও করেছেন ওই এলাকার সাবেক রাজনৈতিক নেতা বিদ্যুৎ।
তবে এরপর থেমে নেই কামরুল। অবৈধ উপার্জনের টাকা দিয়ে কিনেছেন বিঘাবিঘা জমি, করেছেন দু’টি আলীশান বাড়ি। চলছেন ঠাঁঠেবাটে, মোটরসাইকেলের মডেল পাল্টিয়ে চলেন। কামরুল নুরপুর স্কুলের পাশে বাড়ি করেছেন। হাঁসের খামার গরুর খামারও করেছেন। বারোবাজার এলাকায় বিঘা বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। তিনটি ট্রাকের মালিক বনে গেছেন। তার হয়ে কাজ করা বজলু, মিন্টু, সুমন ওরফে পলাশ সবাই থাকেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে।
গত ৫ আগস্টের আগে কামরুল ইসলাম নিজেকে আওয়ামী লীগ কর্মী হিসেবে পরিচয় দিতেন। বর্তমানে তিনি রাজনৈতিক অবস্থান বদলে অপর একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সাথে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। এদিকে দৈনিক গ্রামের কাগজে তার চাকরি প্রতারণার ব্যাপারে পুলিশের বক্তব্য ও মামলার তথ্য দিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে তিনি গ্রাম থেকে গা ঢাকা দিয়েছেন। তবে তার ঠাঁটবাট যায়নি। তিনি আত্মগোপনে থেকেও মাঝেমধ্যে প্রাইভেটে চেপে চলছেন গোপনে। শহরে ঢুকছেন গোপনে। সম্প্রতি শহরের ধর্মতলা মোড়ে তাকে প্রাইভেটে দেখতে পান আশিক ও মিলন মাহমুদ নামে দুই ভুক্তভোগী। এসময় কৌশলে সটকে পড়েন প্রতারক কামরুল।
ভুক্তভোগীদের মধ্যে মাগুরার আজিম উদ্দিন ও রাজশাহীর মাসুম জানিয়েছেন, তাদের কাছ থেকেও কোটি টাকার উপরে টাকা নিয়েছেন চাকরি দেয়ার নামে। কিন্তু সেই টাকা ফেরত দেয়নি। আবার চাকরিও দেয়নি। তাদের অভিযোগ ওই চক্রের বিরুদ্ধে এত অভিযোগ থাকলেও স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ছত্রছায়ায় থাকায় এতদিন কামরুল আটক এড়িয়ে চলেছে। আবার গ্রামের কাগজে সংবাদ হলে তিনি গ্রাম ছেড়েছেন। ভোলপাল্টে রাজনৈতিক ঘরানা পরিবর্তনের চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে গ্রাম ছেড়েছেন।
এর আগে গত বছরের ৫ এপ্রিল কেশবপুরের মজিদপুরের ভুক্তভোগী শ্যামল দাস এই কামরুল চক্রের চাকরি প্রতারণা ও ১৩ লাখ টাকার প্রতারণার ঘটনায় জেলা গোয়েন্দা শাখা ডিবি গত ১২ এপ্রিল আটক করে কামরুলকে।
এলাকাবাসী দাবি করেছে, ৫/৭ বছর আগে পালবাড়ির মন্ডল বেকারির রুটি নিয়ে বিভিন্ন দোকানে বিক্রি করে বেড়ানো কামরুল বিগত বছরগুলোতে চলেছেন ঠাঁটেবাটে। সেনাবাহিনী ও পুলিশ থেকে অবসরে যাওয়া কয়েক অফিসারের নাম ভাঙিয়ে চাকরি দেয়ার নামে যশোরের বিভিন্ন এলাকায় চষে বেড়িয়েছেন কামরুল। কামরুলের সহযোগী বজলু উপশহরে বহুতল বাড়ি করছেন, এড়ান্দার সুমন বহুতল বাড়ি করেছেন, পলাশ শানতলায় বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করছেন। কামরুলসহ ওই চক্রের লোকজনকে আটকের জোর দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে, অভিযান ও মামলা তদন্তে পাওয়া তথ্য থেকে গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, তোলা নূরপুরের মোদাচ্ছের হোসেনের ছেলে কামরুল ইসলাম টাকার বিনিময়ে চাকরি দেয়ার মিথ্যে প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারনা করে বেড়ায়। কেশবপুরের শ্যামল দাসের কাছ থেকে ব্ল্যাংক চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প নেয়াসহ একাধিক ব্যক্তির কাছ থেকে একইভাবে বিভিন্ন সময়ে ব্ল্যাংক চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্প সংগ্রহ করে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ করে। তার চক্রে মনা ওরফে মনির, খসরু, বসিরসহ আরো অনেকে রয়েছে। তারা পরস্পরের যোগসাজসে দীর্ঘদিন এ ধরনের অপরাধ করে আসছে।
গ্রামের কাগজ ইউটিউব চ্যানেলে সাবস্ক্রাইব করুন
মতামত